রমিজ বাবু,চট্টগ্রামঃ প্রতি বছরের মত এবারেও ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাচ্ছে অমর একুশে বই মেলা ২০২৩। কিন্তু স্বস্তি নেই সৃজনশীল লেখক – প্রকাশকদের মনে। কাগজের সংকট আর মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই বছর বই বিক্রি কতটা হবে,তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় প্রকাশক ও মূদ্রন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মাসে কাগজের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অনেক ক্ষেত্রে ভালো মানের কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না বেশি টাকা দিয়েও। বইমেলার বই প্রকাশের চাপের সাথে আছে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজও। ফলে চাহিদার তুলনায় পাওয়া যাচ্ছে না কাগজ, তৈরী হয়েছে কাগজ সংকট। সেক্ষেত্রে বই মেলার বইয়ের দাম ন্যূনতম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন প্রকাশকরা। এছাড়াও কমে যেতে পারে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা।

প্রকাশকদের ভাষ্যমতে, গত জুলাই মাস থেকে যখন ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই কাগজের দামও বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বইপত্র ছাপানো বা পড়াশোনার কাজে হালকা কাগজ ব্যবহৃত হয়। এর পুরোটাই দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে ক্যালেন্ডার, প্যাকেজিং বা গার্মেন্টস শিল্পে ভারী কাগজ দরকার হয়। এটা দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হয়।বাজারে এখন উভয় ধরনের কাগজের সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের কাগজ কারখানাগুলোর কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু ডলারের দাম দেড়গুণ হয়ে যাওয়ার কারণে আমদানি করা পাল্পের জন্য বেশি খরচ করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ফলে অনেকে চলতি মূলধন সংকটে পড়ছেন।
ডলার সংকট থাকায় নতুন করে কাগজ আমদানিতে ঋণপত্র খুলতেও রাজি হচ্ছেনা ব্যাংকগুলো।

দেশে এক বছরের মধ্যে ৮০ ও ১০০ গ্রামের অফসেট ও সাদা কাগজের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আর নিউজপ্রিন্টের দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। এই পরিস্থিতির কারণে বেড়েছে শিক্ষা ব্যয়। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকরা। আশঙ্কা রয়েছে, বেশি দামে বই কিনতে আগ্রহ হারাবেন পাঠকরা।
সৃজনশীল প্রকাশনীগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের দামের চেয়ে বাংলাদেশে কাগজের দাম বেশি। এক বছরের কাগজের দাম প্রায় দিগুণ হয়েছে। দেশে কাগজ নিয়ে যে অস্থিরতা চলছে তাতে দাম কমাতে হলে কাগজ আমদানি আপাতত শুল্কমুক্ত করতে হবে। ৪০ থেকে ৪৯ শতাংশ ট্যাক্স দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে কম দামে কাগজ দেওয়া সম্ভব না। এছাড়া যত কাগজ এই মুহূর্তে দরকার, দেশি কাগজকলগুলো তা সরবরাহ করার সক্ষমতা নেই।
সৃজনশীল বই প্রকাশক জানান, বইমেলার জন্য নতুন বইয়ের প্রায় দশগুণ পুরাতন বই ছাপা হয়। কাগজের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাগজ সংকটের কারণে নতুন লেখকদের একাংশ এবার বই ছাপার সুযোগ পাবেন না।

এই মুহূর্তে দেশি কাগজকলগুলো প্রয়োজনীয় কাগজ সরবরাহ করতে পারছে না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্য বইয়ের জন্য এনসিটিবি কাগজ কিনেছে প্রায় এক লাখ টনেরও বেশি। আগামী জানুয়ারি থেকে প্লে-গ্রুপ, নার্সারির শিক্ষার্থী থেকে মাস্টার্স পড়া শিক্ষার্থীর জন্য যে কাগজ প্রয়োজন তা সরবরাহ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া রয়েছে অনুশীলন বই বা নোটগাইড। সব মিলিয়ে কাগজ সংকট তীব্র হবে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা দেশি কাগজ কলগুলোর নেই।
আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশে কাগজের দাম বেশি বলেও তারা অভিযোগ করেন।

সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকরা জানান, পরিস্থিতি না বদলালে ২০২৩ সালের একুশে বই মেলাসহ শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থবিরতা তৈরি হবে। শিক্ষার্থীরা লেখার কাগজ পাবে না। এমনকি ডায়েরি, ক্যালেন্ডার ও কাগজের ব্যাগ তৈরির কাজও থমকে যাবে।

দেশের বাজারে মুদ্রণ এবং লেখার কাগজের সংকট তৈরি হয়েছে। একটি সিন্ডিকেট চক্র এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কাগজের যে আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, অতীতের যেকোনও সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। এটি ভয়াভয় আকার ধারণ করেছে। আগামী বছরের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় বিঘ্ন তৈরি হবে, তেমনি অমর একুশে বই মেলায় বইয়ের দাম বেড়ে যাবে। প্রকাশকরা নতুন বই প্রকাশ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পাল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে কাগজ তৈরির কাঁচামাল পাল্পের যে পরিমাণে দাম বেড়েছে, তার চাইতে দুই থেকে আড়াই গুণ দাম মিল ও কাগজ ব্যবসায়ীরা আদায় করছে। তাদের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। স্বল্প পরিমাণে পাল্প আমদানি করে কাগজের সংকট তৈরি করে চড়া দামে বিক্রি করছে। অন্যদিকে কাগজ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই তৈরি সংকটে পড়েছে। আগামী বই মেলায় নতুন বই প্রকাশনা কমে যাবে, মূল্য বাড়বে। শিক্ষার্থীদের সহায়ক বই, লেখার খাতাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য কাগজ পাওয়া যাবে না।

দ্রুত সময়ের মধ্যে শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির ঘোষণা চেয়ে শ্যামল পাল বলেন, ‘এখনও সময় আছে। আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে এলসি করে কাগজ আনতে ১৫ দিনের সময় লাগবে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘোষণা দেওয়া হলে পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে কাগজের দাম কমে যাবে।’
বাতিঘর প্রকাশনীর দীপঙ্কর দাস বলেন, ‘পাল্প আমদানি করা যাচ্ছে না। কাগজের দাম বেশি। সে কারণে বইমেলায় তো প্রভাব পড়বেই। যারা কিনতে চাইবে তাদের তো বেশি দামে কিনতে হবে। সব কিছুরই দাম বেড়েছে, এখানেও বাড়বে।’

বাংলাদেশ পেপার ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও এফবিসিসিআই পরিচালক শাফিকুল ইসলাম ভরসা বলেন, ‘এখন যে সংকট সেটা ব্যাংক থেকে এলসি না পাওয়ার কারণে। যাদের ডিউটি ফ্রি অনুমোদন আছে তারাও খুব বেশি এলসি করতে পারছে না। করোনার পর থেকে দেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতো কাগজ নিয়েও সিন্ডিকেটের খেলা চালাচ্ছে। যেভাবে চলছে তাতে শতভাগ মার্জিন দিলেও এলসি দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো।