সিরাজুর রহমানঃ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির দুই প্রধান বৈশ্বিক সুবিধাভোগী দেশ হিসেবে ভারত ও চীন নিজেদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৮২.৫ বিলিয়ন ডলারের পন্য সারা বিশ্ব থেকে আমদানি করে। আর সেই মোট আমদানির মধ্যে বাংলাদেশ শুধুমাত্র ভারত ও চীন থেকে পন্য আমদানি করেছে মোট আমদানির প্রায় ৪১%। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে ১৩.৬ বিলিয়ন ডলার এবং চীন থেকে মোট ১৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারের পন্য আমদানি করে।

আসলে ভারত ও চীন কার্যত তিন দশকব্যাপী নিরবিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশে খাদ্য, পন্য এবং মুলধনী যন্ত্রপাতি এবং বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল রপ্তানি করে গেলেও এর বিপরীতে তারা কিন্তু বাংলাদেশকে খুব একটা ছাড় দিতে রাজি নয়। যেমন গত অর্থবছরে ভারত সারা বিশ্ব থেকে প্রায় ৬১০.২২ বিলিয়ন ডলারের পন্য ও সেবা আমদানি করলেও তারা কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মাত্র ১% এর কম পন্য আমদানি করেছিল। আর এদিকে ভারত কিন্তু ঠিকই তার সুবিধা আদায় করে নিয়ে মোট বৈদেশিক বানিজ্য ও লেনদেনের প্রায় ১০% সেরে ফেলছে শুধু বাংলাদেশের সাথেই।

তবে এটা ঠিক যে, বিগত তিন বছর থেকে ভারতে পন্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২.০০ বিলিয়ন ডলারের পন্য ভারতে রপ্তানি করেছে। তাছাড়া চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে ভারতে আশাবঞ্চক হারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমান অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়ে ৩.০০ বিলিয়ন ডলারের সীমাকে স্পর্শ করতে পারে। ভারতের সরকারের তরফে দেয়া তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে মোট পন্য রপ্তানি করেছিল মোট ১.০৯৬ বিলিয়ন ডলার। যদিও ভারতের সাথে আমাদের বিদ্যমান বৈদেশিক বানিজ্য ঘাটতি মোকাবেলায় তা কিন্তু মোটেও যথেষ্ঠ নয়।

এদিকে চীন ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার ২০২০-২১ অর্থবছরে ১২.৯৩ বিলিয়ন ডলারের পন্য রপ্তানি করেছিল। অথচ চীনের এই সুবিশাল রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশ মাত্র ১.০০ বিলিয়ন ডলারের অনেক কম পন্য চীনে রপ্তানি করার সুযোগ পায়। যদিও চীনের শি জিং পিং সরকার গত বছর বাংলাদেশকে প্রায় ৫ হাজারের কাছাকাছি পন্য বিনাশুল্কে তাদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিল। যার সুফল কিন্তু এখনো পর্যন্ত আদায় করে নিতে পারিনি।

তাছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক পরাশক্তি রাশিয়া বাংলাদেশের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পসহ বেশ কিছু উন্নয়নমুলক প্রকল্পে প্রধান বৈদেশিক অংশীদার এবং বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করলেও সে দেশটির বাজারে আমাদের পন্য রপ্তানির সুযোগ কিন্তু খুবই সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ রাশিয়াতে মোট ৬৩৮.৩০ মিলিয়ন ডালারের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পন্য রপ্তানি করলেও তার বিপরীতে ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশে মোট ১.৭২ বিলিয়ন ডলারের পন্য রপ্তানি করেছিল দেশটি।

বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মিডিয়ায় বাংলাদেশের সাথে ভিয়েতনামের তুলনা দেয়া হয়। অথচ ভিয়েতনামের সার্বিক রপ্তানির সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত কোন আলোচনা করাই হয় না। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান এক অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনাম ২০২১ সালে মোট ৩৩৬.৩১ বিলিয়ন ডলারের পন্য সারা বিশ্বে রপ্তানি করে। আর মোট রপ্তানির মধ্যে দেশটির তৈরি পোশাক রপ্তানির অবদান মাত্র ৮% থেকে ৯%। তাছাড়া দেশটি ২০২০ সালে ৩১৮.২৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৯ সালে ২৮০.৮৩ বিলিয়ন ডলারের পন্য রপ্তানি করেছিল। যদিও দেশটি ২০২১ সালে সারা বিশ্ব থেকে মোট ৩৩২.২৩ বিলিয়ন ডলারের পন্য আমদানি করেছিল এবং ঠিক একই সময়ে ভিয়েতনাম বৈদেশিক বানিজ্যে ৪.০৮ বিলিয়ন ডলারের পজিটিভ (আমদানি-রপ্তানি) ব্যালেন্স অর্জন করে।

এদিকে ২০২১-২২ অর্থবছরে আমাদের দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৫২.০৮ বিলিয়ন ডলার এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাক শিল্প থেকে রপ্তানির পরিমাণ ৪২.৬১৩ বিলিয়ন ডলার এবং এটি ছিল বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১.৮১%। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাত ব্যাতিত অন্যান্য সকল খাত মিলিয়ে রপ্তানি খাতে অবদান মাত্র ১৮.১৯%। যা কিনা উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কেবল অতি মাত্রায় একটি খাত নির্ভর বৈশ্বিক রপ্তানি প্রবণতা ভবিষ্যতে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ ইস্যু হয়ে দেখা দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বানিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি ভারত এবং চীন আরো কিছুটা আন্তরিক ও নমনীয় হলেই কেবল এই দেশ দুটিতে আমাদের পন্য রপ্তানি অবিশ্বাস্যভাবে ১০ বিলিয়ন ডলারের সীমাকে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যেই স্পর্শ করতে পারে। তবে এই ১০ বিলিয়ন ডলারের চ্যালেঞ্জিং রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাকে অর্জন করতে হলে আমাদের নিজস্ব শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকেও আরো শক্তিশালী এবং গতিশীল করে গড়ে তুলতে হবে। তার সাথে দেশীয় কাঁচামাল নির্ভর পন্য রপ্তানিকে আগ্রধিকার দিয়ে পরিকল্পনা মাফিক তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করাটা এখন সময়ের দাবি হয়ে দেখা দিয়েছে।