সিরাজুর রহমান, নাটোর: পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মরক্কো এবার চলতি ২০২৩ সালের মধ্যেই মার্কিন লকহিড মার্টিন কর্পোরেশনের অত্যাধুনিক চতুর্থ প্রজন্মের এফ-১৬ ব্লক ৭০ সিরিজের যুদ্ধবিমান পেতে যাচ্ছে। মরক্কো মূলত মার্কিন এভিয়েশন জায়ান্ট লকহীড মার্টিন কর্পোরেশনের সাথে নতুন করে ২৫টি এই জাতীয় সিঙ্গেল ইঞ্জিনের এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চুক্তি করেছিল। যা কিনা চলতি ২০২৩ সালেই প্রথম ব্যাচে দেশটির কাছে সরবরাহ করবে লকহিড মার্টিন। বর্তমানে রয়্যাল মরক্কো এয়ার ফোর্সে ২৩টি এফ-১৬সি/ডি সিরিজের এডভান্স যুদ্ধবিমান অপারেশনাল রয়েছে।
মরক্কোর বিমান বাহিনীতে বর্তমানে পুরনো ৪৬টি মিরেজ এফ-১, নরথ্রপ এফ-৫ই টাইগার ২৬টি এবং ২৩টি এফ-১৬সি/ডি সিরিজের যুদ্ধবিমান রয়েছে। নতুন করে ২৫টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান চলে আসলে অদূর ভবিষ্যতে মরক্কোর বিমান বাহিনীর এয়ার ফ্লীটে মোট ৪৮টি ৪র্থ প্রজন্মের এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমান অপারেশনাল থাকবে। তাছাড়া মনে করা হয় যে, সৌদি আরবের মোহাম্মদ বিন সালমান মরক্কোর বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নে নতুন করে ক্রয়কৃত এফ-১৬ ব্লক ৭০ সিরিজের ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমান ক্রয়ে গোপনে বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তা দিয়েছে।
এদিকে নেট দুনিয়ায় খবর রটেছে যে, মার্কিন প্রশাসন এবার রাশিয়াকে শায়েস্তা করতে ইউক্রেনের কাছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিতে যাচ্ছে। আসলে আমেরিকা তার দেশে তৈরি একেবারে নতুন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ইউক্রেনকে সরাসরি না দিয়ে ইউরোপে বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত পুরনো এফ-১৬ যুদ্ধবিমান তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিয়েভের হাতে তুলে দিতে চায়। এর বিনিময়ে চুক্তি মোতাবেক পুরনো এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহকারী দেশকে একেবারে নতুন বা সর্বশেষ প্রযুক্তির এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন ফাইটার জেট দিবে আমেরিকা।
তুরস্ক কয়েক বছর ধরেই আমেরিকার কাছ থেকে নতুন করে ৪০টি লকহিড মার্টিন নির্মিত সিঙ্গেল ইঞ্জিনের এফ-১৬ ব্লক-৭০/৭২ ভাইপার জেট ফাইটার কেনার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। তবে মার্কিন আইন প্রণেতারা এর ব্যাপক বিরোধিতা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের মুখে মার্কিন প্রশাসন তুরস্ককে নিজ হাতে রাখতেই নতুন করে ৪০টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রয়ের উপর সকল বাধা ও আইনগত জটিলতা অপসারণ করে ফেলেছে। তাছাড়া তুরস্কের বিমান বাহিনীর এয়ার ফ্লীটে থাকা পুরনো ৮০টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের আধুনিকায়নের জন্য মর্ডানাইজেশন কিটস সরবরাহের সকল নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নিয়েছে বা নিতে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।
তাছাড়া ইউরোপের আরেক দেশ বুলগেরিয়া সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র ১৬টি হাইলী এডভান্স এফ-১৬ভি ব্লক ৭০/৭২ সিরিজের সিঙ্গেল ইঞ্জিনের যুদ্ধবিমান ক্রয়ের জন্য মোট ২.৯৯ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করতে যাচ্ছে। সে হিসেবে অবিশ্বাস্যভাবে ট্রেনিং, লজিস্টিক সাপোর্ট এন্ড ওয়েপন্স প্যাকেজসহ প্রতিটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের পার ইউনিট কস্ট হয় ১৮৬.৮৮ মিলিয়ন ডলার। যা কিনা সিঙ্গেল ইঞ্জিনের যুদ্ধবিমান হিসেবে বুলগেরিয়া অনেক বেশি মূল্য দিতে যাচ্ছে বলে মনে করা হয়।
বর্তমানে আমেরিকার এভিয়েশন জায়ান্ট লকহীড মার্টিন কর্পোরেশনের তৈরি চতুর্থ প্রজন্মের একেবারে সর্বশেষ সিরিজের এফ-১৬ (ভাইপার) ব্লক-৭০/৭২ এর সার্ভিস লাইফ টাইম ধরা হয়েছে ২০৭২ সাল পর্যন্ত। অর্থ্যাৎ এপিজি-৮৩ (এইএসএ) রাডার সমৃদ্ধ এফ-১৬ ব্লক-৭০/৭২ সিরিজের এডভান্স জেট ফাইটার আগামী চার দশক পর্যন্ত আকাশে রাজত্ব করে বেড়াবে। এদিকে এফ-৩৫ স্টেলথ জেট ফাইটার জটিলতায় মার্কিন বিমান বাহিনীতে অপারেশনাল থাকা পুরনো মোট ৯৩৪টি এফ-১৬সি/ডি ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমানের একটি বড় অংশ আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত সার্ভিসে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনী।
এদিকে এফ-১৬ এর ব্লক-৬০ বিশেষভাবে তৈরি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য। এই ব্লক-৬০ তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট বিনিয়োগ ৩.০০ বিলিয়ন ডলার এবং মার্কিন বিমান বাহিনী যে এফ-১৬ জেট ফাইটার রয়েছে তার চেয়ে আরো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয় এফ-১৬ ব্লক-৬০ এর জেট ফাইটারগুলোকে। আর এই প্রডাকশন লাইনে তৈরিকৃত এফ-১৬ এর পুরোটাই অপারেট করে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
প্রাট এণ্ড হুইটনী এফ-১০০-পিডাব্লিউ-২২৯ কিংবা জেনারেল ইলেক্ট্রিক এফ-১১০-জিই-১২৯ আফটার টার্বোফ্যান ইঞ্জিন সমৃদ্ধ সর্বশেষ সিরিজের এফ-১৬ ব্লক ৭২ এর পার ইউনিট কস্ট আনুমানিক ১২০-১৫০ মিলিয়ন ডলার (মিসাইল, ওয়েপন্স, ট্রেনিং, মেইনটেনেন্স প্যাকেজসহ) পর্যন্ত হতে পারে। তবে ইউকীপিডায় বা অন্যান্য ওয়েবসাইটে যে মূল্য দেয়া থাকে তা কিন্তু শুধু মূল বিমানটি আনুমানিক মূল্য প্রদর্শন করে।
আমেরিকার তৈরি আধুনিক এফ-১৬ এর অন্যতম অস্ত্র হলো মার্কিন রেইথন কোম্পানির ১৬০ কিলোমিটার রেঞ্জের এআইএম-১২০ডি (বিভিআর) এডভান্স মিডিয়াম রেঞ্জ এয়ার টু এয়ার মিসাইল (এএমআরএএএম) এবং তার পাশাপাশি রয়েছে এআইএম-৯ সাইডউইণ্ডার ও এআইএম-৭ স্প্যারো শর্ট রেঞ্জের এয়ার টু এয়ার মিসাইল। আবার গ্রাউণ্ড এ্যাটাক ফ্যাসালিটির জন্য এজিএম-৮৮/১৫০ এয়ার টু সারফেস মিসাইল এবং এন্টিশীপ মিসাইল হিসেবে এজিএম-৮৪ হারপুন মিসাইল ব্যাবহার করে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান।
তবে ১৯৭৮ সালে সার্ভিসে আসার পর থেকে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত মোট ৬৭৪টি বা তার কাছাকাছি এফ-১৬ জেট ফাইটার বিভিন্ন কমব্যাট এণ্ড নন-কমব্যাট মিশনে ধ্বংস হয়েছে। ১৯৭৩ সাল থেকে এর প্রডাকশন লাইন শুরু করা হলেও এ পর্যন্ত মোট ১৫টি ব্লকে এবং এ, বি, সি, ডি, ই এফ, আইএন সিরিজে ধাপে ধাপে আপগ্রেডেশন এবং নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আরো অত্যাধুনিক এফ-১৬ভি বা ব্লক-৭০/৭২ পর্যায়ে এসে পৌছেছে। এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের ম্যাসিভ প্রডাকশন লাইনে আজ পর্যন্ত ১, ৫, ১০, ১৫, ২০, ২৫, ৩০, ৩২, ৪০, ৪২, ৫০, ৫২, ৬০, ৭০ এবং ৭২ ব্লকে তৈরি হয়েছে। যা কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোন যুদ্ধবিমান এতগুলো ব্লকে এবং ভ্যারিয়েন্টে তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
১৯৭৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৪,৬০০টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান তৈরি করা হলেও বর্তমানে প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি বিভিন্ন সিরিজের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিশ্বের মোট ২৫টি দেশের বিমান বাহিনীতে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। তবে মার্কিন বিমান বাহিনী সর্বোচ্চ সংখ্যক ৯৪৩টি এবং নৌবাহিনী ১৪টি বিভিন্ন সিরিজের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান অপারেট করে। তাছাড়া মিশর ২১৮টি, তুরস্ক ২৪৫টি, ইসরাইল ১৭৫টি, দক্ষিণ কোরিয়া ১৬৭টি, গ্রীস ১৫৪টি, ইন্দোনেশিয়া ৩৩টি, সিঙ্গাপুর ৬০টি, তাইওয়ান ১১০টি (৫৬টি নতুন অর্ডার দেয়া আছে), সংযুক্ত আরব আমিরাত ৭৮টি এফ-১৬ই (ব্লক-৬০) এবং পাকিস্তান ৭৫টি এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমান (১৮টি সি/ডি ব্লক-৫২) অপারেট করে। তাছাড়া মার্কিন বিরোধী শিবিরের একমাত্র দেশ হিসেবে ভেনিজুয়েলার বিমান বাহিনীতে এফ-১৬এ/বি সিরিজের যুদ্ধবিমান রয়েছে ২০টি।
বিগত চার দশকে এফ-১৬ আনুমানিক মোট ৮৮টি শত্রু পক্ষের জেট ফাইটার, বোম্বার, হেলিকপ্টার এবং বিভিন্ন ধরণের এরিয়াল সিস্টেম সরাসরি এয়ার টু এয়ার মিসাইল হীটে ধ্বংস করার রেকর্ড রয়েছে। তাছাড়া ২০১৯ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি ভারত পাকিস্তান আকাশ যুদ্ধে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি এফ-১৬ ভারতের মিগ-২১ শুট ডাউন করে।
মার্কিন এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন ফাইটার জেট এ পর্যন্ত ১৯৯০-৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধ, ১৯৯৪-৯৫ সালে বসনিয়ায় সার্বিয়ার সামরিক আগ্রাসন প্রতিরোধ, কসভো স্বাধীনতা যুদ্ধে, গ্রীক-তুর্কী সামরিক সংঘর্ষ ছাড়াও আফগানিস্থান, লিবিয়া, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকের আকাশে ব্যাপকভাবে ব্যাবহার করা হয়েছে। তাছাড়া ইসরাইল কিন্তু প্রতি নিয়ত গাজা ও সিরিয়ায় সামরিক আগ্রাসন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপকভাবে এফ-১৬ জেট ফাইটার ব্যাবহার করে। তাছাড়া এই জেট ফাইটারের কমব্যাট এয়ার মিশনে কিলিং রেকর্ডের তালিকায় মিগ-২১, মিগ-২৩, মিগ-২৯, এফ-৪, এফ-১৬, এমআই-৮ ও এম আই-১৭ হেলিকপ্টার, এসইউ-২২, এসইউ-২৫, এসইউ-২৪, এটি-২৭ টুকনো, অরিয়ন-১০ ড্রোন ছাড়াও বেশকিছু ইউএভি এবং অন্যান্য এরিয়্যাল সিস্টেম রয়েছে।







