সিরাজুর রহমান, নাটোরঃ ভারতের বিমান বাহিনীর সবচেয়ে এডভান্স ও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে ৪++ প্রজন্মের ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমানের সর্বশেষ ৩৬ তম যুদ্ধবিমানটি গত ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসেই হাতে পেয়ে যায়। মূলত ফ্রান্সের ডেসাল্ট এভিয়েশন কর্পোরেশনের কাছ থেকে ৮.৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমানের সম্পূর্ণ সরবরাহ পেল ভারতের বিমান বাহিনী। যদিও এর জন্য ভারতকে প্রায় এক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে।

এদিকে এখন আবার ভারতের নৌবাহিনীর জন্য নতুন করে আরো ২৬টি রাফাল-এম সিরিজের সর্বশেষ প্রযুক্তির ক্যারিয়ার বেসড কমব্যাট এয়ারক্রাফট ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা দপ্তর। চলতি ২০২৩ সালের মার্চ মাসের দিকে খুব সম্ভবত ফ্রান্সের সম্মানিত প্রেসিডেন্ট ভারত সফরের সময় চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করা হতে পারে। যদিও অবশ্য বর্তমানে ভারতের নৌবাহিনীতে ক্যারিয়ার বেসড ৩৫টি মিগ-২৯কে সিরিজের যুদ্ধবিমান অপারেশনাল রয়েছে। তবে ২০২৩ সালে রাফাল ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্ত হলেও ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধবিমানের ব্যাপক বৈশ্বিক চাহিদা ও পূর্বের অর্ডার থাকায় আগামী ২০২৭ সালের আগে এর ডেলিভারি পাওয়ার সম্ভাবনা এক রকম নেই বললেই চলে।

বর্তমানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির এয়ার এন্ড নেভাল ফোর্সের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা অনেকটা বেশি বলে মনে করা হলেও বাস্তবে ভারতের নিজস্ব চাহিদা মাফিক কাস্টমাইজড করা ২৬০টি এসইউ-৩০এমকেআই হেভি জেট ফাইটার, ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান কিন্তু আকাশ যুদ্ধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও গুণগত মানের বিচারে মোটেও পিছিয়ে নেই। বরঞ্চ ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোকাবেলা করার মতো চীনের কাছে আপাতত ডেডিকেটেড এন্ড হাইলি এডভান্স জেট ফাইটার নেই।

বর্তমানে রাফালে এডভান্স জেট ফাইটার অপারেট করার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ১০২টি রাফাল রয়েছ ফ্রান্সের বিমান বাহিনীতে। তাছাড়া ভারত ৩৬টি মিশর ২৪টি, কাতার ২৭টি (আরো ৯টি অর্ডার করা আছে) এবং গ্রীস ১৮টি রাফাল জেট ফাইটার অপারেট করে। তবে চলিতি বছরেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ৮০টি, মিশর ৩০টি এবং ইন্দোনেশিয়া ৪২টি রাফাল জেট ফাইটার ক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করেছে।

ফ্রান্সের ডেসাল্ট এভিয়েশনের তৈরি রাফালে ৪++ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে ইউরোফাইটার তাইফুন এবং রাশিয়ার এসইউ-৩৫, মার্কিন এফ-১ইএক্স এর পাশাপাশি সবার উপরে উঠে এসেছে রাফালের নাম। তাছাড়া ফ্রান্স কিন্তু অনেক আগেই ইউরোফাইটার তাইফুন প্রজেক্ট থেকে বের হয়ে গিয়ে একেবারে নিজস্ব উচ্চ প্রযুক্তির হাইলি এডভান্স রাফায়েল জেট ফাইটার সার্ভিসে এনেছে।

ভারতের বিমান বাহিনী তার শক্তিশালী ও লং রেঞ্জের রাফাল জেট ফাইটার ফ্লীটের জন্য ৪ ম্যাক গতির ১১০ কিলোমিটার পাল্লার মেটওর এয়ার টু এয়ার (বিভিআর) মিসাইলের পাশাপাশি আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা চালানোর উপযোগী হাম্মার এয়ার টু গ্রাউণ্ড মিসাইল সিস্টেম ক্রয় করার চুক্তি বেশ আগেই সম্পন্ন করেছে। তাছাড়া হাম্মার বা Highly Agile Modular Munition Extended Range (HAMMER) হচ্ছে একটি হাইলি এডভান্স মধ্যম পাল্লার গ্রাউণ্ড এ্যাটাক মিসাইল সিস্টেম।

এখানে প্রকাশ থাকে যে, গত ২০২০ সালের জুলাই কিংবা আগস্ট মাসে লিবিয়ায় থাকা তুরস্কের সামরিক ঘাঁটিতে খুব সম্ভবত ফ্রান্সের তৈরি বেশকিছু রাফাল জেট ফাইটার এয়ার স্টাইক চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে একেবারেই নিরাপদে পালিয়ে যায়। যদিও অবশ্য তুরস্কের তরফে এ সংক্রান্ত বিষয়ে কোন তথ্য প্রকাশ করা হয় নি। অথচ লিবিয়ায় থাকা তুরস্কের ঘাঁটিতে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি কোরাল জ্যামার, দীর্ঘ পাল্লার রাডার সিস্টেম এবং মিম-২৩ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও রাফালের বিমান হামলা প্রতিহত করতে পারেনি।

আবার মিসাইল হামলাটি কোন দেশ থেকে চালানো হয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও ফ্রান্সের তৈরি রাফাল জেট ফাইটার লিবিয়ার আকাশের অনেক গভীরে প্রবেশ করে এন্টি রেডিয়েশন মিসাইল হামলা চালিয়ে আবার নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে গেলেও সামরিক বেসে থাকা তুরস্কের রাডার ধ্বংসের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত আকাশে রাফালের উপস্থিতি এবং মিসাইলগুলো কোন ভাবেই সনাক্ত করতে সক্ষম হয় নি।

২০১০ সালের দিকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে লিবিয়ার তৎকালীন গাদ্দাফি সামরিক বাহিনীর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে বিশ্ব মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ফ্রান্সের ড্যাসাল্ট রাফায়েল যুদ্ধবিমান। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে ইরাক এভং সিরিয়ায় অসংখ্য বার কমব্যাট এয়ার মিশনে সফতার সাথে অংশগ্রহণ করে। আবার ফ্রান্সের তৈরি রাফাল জেট ফাইটারকে কিন্তু প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করার পাশাপাশি ট্যাক্টিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন্স বহন করার বিশেষ উপযোগী করে ডিজাইন করেছে ফ্রান্সের ডেসাল্ট এভিয়েশন কর্পোরেশন।

ইন্টারনেটের একাধিক সূত্রে ফ্রান্সের রাফায়েল জেট ফাইটারের পার ইউনিট কস্ট ৮০ মিলিয়ন ডলার দেখানো হলেও বাস্তবে এর দাম কিন্তু ওয়েপন্স, লজিস্টিক সাপোর্ট এন্ড ট্রেনিং প্যাকেজসহ ২২০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হয়ে যায়। আবার এর পার আওয়ার ফ্লাইট এন্ড অপারেটিং কস্ট প্রায় ১৮ হাজার ডলার। যেখানে কিনা মার্কিন এফ-৩৫ স্টেলথ জেট ফাইটারের পার আওয়ার অপারেটিং কস্ট প্রায় ৩৬ হাজার ডলার এবং ইউরোপের মাল্টিনেশন প্রজেক্ট ইউরোফাইটার তাইফুন জেট ফাইটারের পার আওয়ার অপারেটিং কস্ট ১৬-১৮ হাজার ডলার দেখানো হয়েছে।

বর্তমান যুগে যুদ্ধবিমানের রাডার ক্রস সেকশন বা (আরসিএস)-কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখা হয়। যে যুদ্ধবিমানের আরসিএস যতই কম হবে তা শত্রু পক্ষের রাডারে সনাক্ত করাটা ততই জটিল ও কঠিন একটি কাজ হবে। তাই আরসিএস সক্ষমতার বিবেচনায়, আমেরিকার চতুর্থ প্রজন্মের এফ-১৬ সিরিজের যুদ্ধবিমানের আরসিএস ৩-৫ স্কোয়ার মিটার এবং এফ-১৫ জয়েন্ট স্টাইক ঈগলের ক্রস সেকশন ১৫।

যেখানে ইউরোফাইটার তাইফুনের আরসিএস ০.৫ স্কোয়ার মিটার এবং এডভান্স রাফায়েল জেট ফাইটারের আরসিএস ১.০ স্কোয়ার মিটার দেখানো হয়েছে। আবার মার্কিন বোয়িং কর্পোরেশনের ৪.৫ জেনারেশনের এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমানের আরসিএস ১ স্কোয়ার মিটার। তাই এদিক থেকেও আকাশে এয়ার টু এয়ার ডগফাইটে রাফায়েল জেট ফাইটার কিন্তু অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।