সীন্দবাদ ডেস্ক :: লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চল ও এডেন উপসাগরের মধ্যে চলাচলকারী ২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে গত বছরের ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত।

লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় মার্স্ক গত ১৫ ডিসেম্বর বিকল্প রুট ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানো শুরু করে। বিকল্প রুটে জাহাজ চালাতে তিন ধরনের সারচার্জ (অতিরিক্ত কর বা মাসুল) নির্ধারণ করে কোম্পানিটি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক নৌ টহল দল কাজ শুরু করলে ডিসেম্বরের শেষ দিকে লোহিত সাগরে পুনরায় জাহাজ চালানো শুরু করে মার্স্ক। কিন্তু লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা না থামায় সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি এই রুটে জাহাজ পরিচালনা বন্ধ করে দেয় মার্স্ক।

কোম্পানিটি জানায়, তাদের জাহাজগুলো এখন থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে চলাচল করবে। সর্বশেষ শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মতো বৃহৎ শিপিং কোম্পানি মার্স্ক লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে তাদের পরিষেবা বন্ধের ঘোষণা দেয়।

লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পরেছে। এর জেরে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আফ্রিকা ঘুরে যেতে হচ্ছে। তাতে জাহাজগুলোর গন্তব্যে পৌঁছাতে ১৪ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় লাগছে, ফলে বাড়ছে খরচ, তাই বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দামও। আশঙ্কা করা হচ্ছে এ খরচ আরো বাড়বে। এছাড়া পণ্যের মানেও এর প্রভাব পরছে। এরই সাথে কাঁচামাল আমদানি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশংঙ্খা করছেন ব্যবসায়ী, শিপিং কোম্পানি ও পণ্য সরবরাহকারীরা।

কলম্বো থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে ১৮ থেকে ২০ দিন, সিঙ্গাপুর থেকে পৌঁছাতে ২০ থেকে ২৩ দিন এবং মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং থেকে পৌঁছাতে প্রায় ২৭ দিন সময় লাগে। প্রতি মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার কন্টেইনার (টোয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট ক্লাং হয়ে সুয়েজ খাল দিয়ে ইউরোপে পৌঁছায়।

বিজিএমইএ‘র সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, লোহিত সাগরে হামলার কারণে সাপ্লাই চেইনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রপথে এই সংকট পোশাক খাতে নতুন সংকট তৈরি করবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিকল্প রুটে জাহাজ চলাচলের কারণে বীমা ও জ্বালানি খরচ বেড়েছে। এর প্রভাবে শিপিং কোম্পানিগুলো কন্টেইনার ও জাহাজে পণ্য পরিবহনের চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রাম এবং ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনার পরিবহনের চার্জ ইতোমধ্যে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বীমা এবং উচ্চ জ্বালানি খরচসহ পণ্যের পরিবহন খরচ দ্বিগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও ক্রাউন ন্যাভিগেশনের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহেদ সারোয়ার বলেন, লোহিত সাগরে হামলার প্রভাবে এখন বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী একটি কন্টেইনারের ভাড়া গুণতে হচ্ছে ৪ হাজার ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের বন্দরে ২০ ফুটের একটি কন্টেইনার বহনে জাহাজ ভাড়া ছিল দেড় হাজার ডলার। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ডলার।

লোহিত সাগরে জঙ্গি হামলার এই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে কাঁচামাল আমদানি, তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন দেশের ব্যবসায়ীরা।

লোহিত সাগরে ক্রমাগত হামালায় জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে এমএসসি, মার্স্ক, সিএমএ–সিজিএম, কসকো ও হ্যাপাগ লয়েড ইত্যাাদি। এই কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি পণ্যের প্রায় অর্ধেক কন্টেইনার পরিবহন করে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শফিকুল আলম জুয়েল জানান, লোহিত সাগরে এসব হামলার প্রভাব ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্যের ৬৩ শতাংশের গন্তব্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আমদানি পণ্যের ৮ শতাংশ আসে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে।