সিরাজুর রহমান, নাটোর: চলমান বৈশ্বিক মহামন্দা ও রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যেও সকল প্রতিকূলতাকে এড়িয়ে ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ। বিশেষ করে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের সম্মানিত প্রবাসী কর্মীরা দেশে ১২.৪৫২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। তাছাড়া আমাদের সম্মানিত প্রবাসী কর্মীরা গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১.০৩২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪.৭৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে পাঠিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১.৯৫৯ বিলিয়ন ডলার। গত ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ১.৭ বিলিয়ন ডলার এবং নভেম্বর মাসে ১.৫৯৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে। যদিও একক কোন মাস হিসেবে ২০২১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ ২.১৭১ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছিল।

আসলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে বিগত চার দশক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তাই স্বল্প আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের প্রবাহ ঠিক রাখার বিকল্প কিছুই আর হতে পারে না। তবে এটা ঠিক যে, দেশে অবৈধ অর্থিক সিন্ডিকেট বা হুন্ডিকে নিরুৎসাহিত এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে আমাদের দেশে প্রতি বছর গড়ে কমপক্ষে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রেমিট্যান্স হিসেবে আয় করা সম্ভব হতো।

বিদেশের মাটিতে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অনেক প্রবাসী কর্মীর কাজ বা ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ও বিভিন্ন জটিলতায় তারা নতুন করে আকাম সংগ্রহ করতে পারেন না। তাছাড়া বিদেশে গিয়ে বৈধভাবে কাজ না পাওয়া কিংবা কাজের অনুমতি না থাকায় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ করতে পারেন না। এক্ষেত্রে অনেকেই এক রকম বাধ্য হয়েই কিন্তু অবৈধ সিন্ডিকেট বা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠিয়ে থাকেন। তাই বিদেশে অবস্থানরত আমাদের দূতাবাসগুলোকে প্রবাসী কর্মীদের এহেন সকল সমস্যা ও জটিলতা খুব দ্রুত সমাধানে কাজ করে বৈধ ব্যাংকিং পথে রেমিট্যান্স আসার বিষয়টি যতটা সম্ভব নিশ্চিত করতে হবে।

২০২২ অর্থবছরে আমাদের বন্ধুদেশ ভারত রেমিট্যান্স হিসেবে সর্বোচ্চ ৮৯ বিলিয়ন ডলার এবং গত ২০২১ সালে ৮৭ বিলিয়ন ডলার আয় করে। যা কিনা বিশ্বের কোন একক দেশ হিসেবে এটি সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয়। তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের গবেষণা মতে ভারতের রেমিট্যান্স প্রবাহ ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সীমাকে অতিক্রম করতে যাচ্ছে। আর দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ পাকিস্তান ২০২২ অর্থবছরে ৩১.২৮ বিলিয়ন ডলার ২০২১ অর্থবছরে ২৯.৪৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে আয় করে। যদিও সেন্ট্রাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের দেয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারির হিসেব অনুযায়ী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে মাত্র ২.৯২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে।

এদিকে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলংকা’র দেয়া তথ্যমতে, শ্রীলংকা রেমিট্যান্স হিসেবে গত ২০২২ সালে ৩.৭৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২১ সালে ৫.৪৯ বিলিয়ন ডলার আয় করে। তবে চলতি ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস শেষে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ২.১২ বিলিয়ন ডলারে উঠে আসে। তাছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ নেপাল রেমিট্যান্স হিসেবে গত ২০২২ সালে ৮.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করে। তাই পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলোর পাহাড় সমান বৈদেশিক ঋন ও দেনার বিপরীতে একেবারে স্বল্প পরিমাণের ফরেক্স রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স আয় কিন্তু মোটেও যথেষ্ঠ কিছু হতে পারে না। যা অবশ্যই অন্যান্য সকল উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশের জন্য চরম সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।