সীন্দবাদ ডেস্ক: রমজান মাস শুরুর এক মাস আগে থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকরি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। বেড়েছে ছোলা, মটর ও খেজুরসহ নিত্যপণ্যের দাম। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে একদিনেই ব্রয়লার মুরগি কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। আর এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বা ৫৮ শতাংশ দাম বেড়েছে। বাজারে পর্যাপ্ত শাকসবজি থাকলেও কিছু সবজির কেজি দেড়শ টাকা ছুঁইছুঁই। বেড়েছে আমদানীকৃত সব ধরনের ফলের দামও। দোকানে মিলছে না পর্যাপ্ত চিনি ও ছোলা। ডিম, মসলা ও মাছ-মাংসসহ প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যেরই দাম বেড়েছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজার ঘুরে গতকাল এ চিত্র দেখা গেছে।
বাংলাদেশে ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বাজারে এক মাস আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৪০-১৫৫ টাকায়। গতকাল বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ২৪০-২৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ব্রয়লার। অর্থাৎ এক মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। এক মাস আগে ২৫০-২৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া সোনালি মুরগিও কিনতে হচ্ছে ৩৩০-৩৪০ টাকায়। প্রতি ডজন ডিম এক মাস আগে ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
রমজানের আগে মুরগির দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এ বিষয়ে কারওয়ান বাজারের মুরগি বিক্রেতা মো. আ. আউয়াল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিনিয়তই দাম বাড়ছে। বেশি দামে কিনতে হয়, এ কারণে আমাদের কিছু করার নেই। দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের বিক্রি কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। বেশি দাম থাকলে তো মানুষ কিনতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক।’
খাদ্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মুরগি ও ডিমের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘কয়েকটি কোম্পানি মূলত প্রান্তিক খামারিদের ধ্বংস করছে। সিন্ডিকেট করে তারা খাবার ও মুরগির বাচ্চার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ৯ টাকার বাচ্চার দাম হুট করে উঠে গেছে ৬০ টাকায়। খাদ্যের দামও কয়েকদিনে বস্তায় (৫০ কেজি) ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে। তারাই মুরগি ও ডিমের বাজার পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করছে। করপোরেট কোম্পানিগুলো উৎপাদন বন্ধ না করলে কখনই বাজার স্থিতিশীল হবে না। আমরা প্রান্তিক খামারিরাও চাই না বাজার এমন অস্থিতিশীল থাকুক।’
এদিকে গরুর মাংসের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে। মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ মাছের বাজারেও। এক মাসের ব্যবধানে প্রায় সব মাছেই ৩০-৫০ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি তেলাপিয়া ২২০-২৪০, মাঝারি আকৃতির রুই ও কাতলা ৩৩০-৩৫০ এবং পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়।
করলা, পটোল, ঢেঁড়স, বরবটিসহ বেশকিছু সবজির দামও এখন নাগালের বাইরে। বাজারে বরবটি প্রতি কেজি ১০০-১২০, করলা ও পটোল ১৩০-১৬০, ঢেঁড়স ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কাঁচা মরিচের কেজি চড়েছে ১৪০-১৬০ টাকায়। ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতি পিস ৩০-৩৫, লাউ ও চালকুমড়া ৭০-৮০, মিষ্টিকুমড়া প্রতি কেজি ৪০, টমেটো ৩৫-৪০, বেগুন ৬০, শসা ৪০ এবং শিম মানভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকায়।
চায়না আদার দাম একদিনে বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা। গত বৃহস্পতিবার ২২০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও গতকাল ২৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। থাই আদা একদিনে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ২৪০ টাকায়। বার্মা আদা ১৪০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া চায়না রসুনের কেজি ১৯০ ও দেশী রসুন বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা করে।
এখনো স্থিতিশীল হয়নি চিনির বাজার। রাজধানীর বেশির ভাগ দোকানেই প্যাকেটজাত চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি দোকানে খোলা চিনি পাওয়া গেলেও প্রতি কেজি ১১৫-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাম না প্রকাশ করার শর্তে একজন বিক্রেতা বলেন, ‘সিন্ডিকেট করে চিনি মজুদ করে রেখেছে কিছু ব্যবসায়ী। শুল্ক ছাড় পেলে শুনেছি তারা বাজারে ছাড়বে। এছাড়া ছোলারও সংকট তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৯০-৯৫ টাকা কেজিতে।’
আমদানি করা প্রায় সব ফলের দামও বেড়েছে। আপেল মানভেদে প্রতি কেজি ২৮০-৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডালিম ৩০০-৪০০, মাল্টা ২০০-২২০, কমলা ২১০-২৩০ ও আঙুরের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৮০-৩৫০ টাকায়।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আরিফুর রহমান। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবার নিয়ে চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন জানিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে দাম বাড়ে। কিন্তু কমতে দেখা যায় না। আমাদের বেতন তো বাড়ছে না। এখনই অনেক মানুষ খুব কষ্টে দিনাতিপাত করে। মাসের অর্ধেক না যেতেই পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে ঢাকায় থাকা সম্ভব হবে না।’
কিছু মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে নিয়ন্ত্রণের কারণে বাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে বলে মনে করেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই বলে আসছিলাম, রমজানের আগে দাম বাড়বে না বলে আগেই দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। বারবার বলা হয়, বাজারে কোনো সিন্ডিকেট নেই। কিন্তু চিনি, সয়াবিন তেল, ফল, গমসহ বিভিন্ন পণ্য কয়েকজন ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি হয়ে আছে। গুটিকয়েক মানুষ বাজারের দাম নির্ধারণ করছে। এটা সামাজিক সংক্রমণ হয়ে গেছে। সমিতির নামে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এমন হতে থাকলে মানুষ জিম্মি ও অসহায় হয়ে পড়বে। সিন্ডিকেট নাই নাই বলে সমস্যাকে উড়িয়ে দেয়া হলে এটা আরো প্রকট হবে।’







