সিরাজুর রহমান, নাটোরঃ দীর্ঘদিন থেকেই চরম অর্থনৈতিক সংকটে ভুগতে থাকা পাকিস্তান নাকি ইতোমধ্যেই দেউলিয়া হয়ে গেছে। আর এমনটি দাবি করেছেন খোদ পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি অবশ্য দেশটির করুন পরিণতির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিবিদসহ সবাইকে দায়ী করেছেন। তবে তিনি কিন্তু ঠিকই অত্যন্ত সুকৌশলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর নামটি এড়িয়ে গেছেন। প্রায় ১২৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋনের (ডিসেম্বর ২০২২) দায় মাথায় নিয়ে এই দেশটি বর্তমানে যে দেউলিয়াত্বের খাদে এসে ঠেকেছে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
মূলত গত ৯ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান ঋণ সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই শেষ যায়। অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে আইএমএফ’র দেয়া পূর্বের শর্তগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তানকে ঋন সহয়তা বা বেল আউট প্যাকেজ ছাড় করা যাচ্ছে না বলে মনে করা এই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাটি।
চরম অর্থনৈতিক সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মোকাবেলায় পাকিস্তানের সাবেক ইমরান সরকার ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কাছে ২০১৯ সালে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ আবেদন করেছিল। আইএমএফ প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানকে এই ঋন সহায়তা বা বেল আউট প্যাকেজ প্রদানে সম্মতি জানালেও তা আজ অব্ধি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। নতুন সরকারের আমলে আবারো ঋন প্রাপ্তির আলোচনা আবারও নতুন করে শুরু হলে তাও আবার কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। অথচ চলতি ২০২৩ সালের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋনের আসল কিস্তি ও সুদ পরিশোধ বাবদ ২২ বিলিয়ন ডলার জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন পাকিস্তানের।
সেন্ট্রাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের দেয়া তথ্যমতে, গত ১০ই ফেব্রুয়ারির হিসেব অনুযায়ী পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭৬ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ৩.১৯৩ বিলিয়ন ডলারে উঠে এসেছে। যদিও দেশটির বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ৫.৫০৯ বিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে পাকিস্তানের হাতে বর্তমানে মোট ৮.৭০২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। আর এই ভয়াবহ মাত্রায় এই রিজার্ভ ঘটতি মোকাবিলায় পাকিস্তান আইএমএফ এর বেল আউট ঋন প্যাকেজ সহায়তা পাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও দুই পক্ষ এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত সমাঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
পাকিস্তানের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণটি সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে দেশটির বৈদেশিক বানিজ্য বা আমদানি রপ্তানির বৈষম্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। ২০২২ অর্থবছরে পাকিস্তানের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩১.৭৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ একই সময়ে এর বিপরীতে বৈদেশিক আমদানির পরিমান ছিল প্রায় ৮০.০১৯ বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া দেশটি গত ২০২২ সালে রেমিট্যান্স হিসেবে আয় করে ৩১.২৭৮ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক উৎস হতে ঋন প্যাকেজ সহায়তা গড়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার পেলেও একই সময়ে বৈদেশিক ঋনের আসল ও সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয় প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে দেশটির অভার অল ব্যালেন্স অব পেমেন্টে নেট ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১৯ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের। যা রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স দ্বারা পূরণ না হওয়ায় ভয়াবহ আকারের ফরেক্স এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ ঘাটতির মুখে পড়তে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তান। তার সাথে রয়েছে দেশটি থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের মতো মরণ ব্যাধির ক্ষত।
এদিকে পাকিস্তান বর্তমানে এক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋন ও সুদের অর্থ পরিশোধ করতে আরেক দেশ ও দাতা সংস্থার কাছে থেকে নতুন করে বড় অংকের ঋন গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, শুধুমাত্র চীনের কাছে দেশটির মোট ঋনের স্থিতির পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। দেশটি থেকে বর্তমানে ঠিক কি পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে তার সঠিক কোন তথ্য উপাত্ত প্রকাশ না হলেও প্রতি বছর আনুমানিক ৭ বিলিয়ন ডলার পাকিস্তান থেকে সরাসরি বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে কার্যত পাকিস্তান বর্তমানে দেউলিয়া হওয়ার মতো উচ্চ ঝুঁকিতে চলে গেছে। যা থেকে অবশ্যই বিশ্বের স্বল্প আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিক্ষা ও সতর্কতামূলক বার্তা বহণ করে।







