প্রথম পর্ব
এক.
শিল্প এবং ঋণ-একই মুদ্রার এপিঠ,ওপিঠ। যদিও শিল্প মাত্রই ঝণে গড়া-এমন না। আবার সকল ঋণ শিল্প খাতে-এমনও না। তবে ঋণের প্রধান প্রবণতা শিল্প খাতে। বিশ্বে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ, বছর প্রতি বিনিয়োগ হয়। দেশে লক্ষ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের বৃহদাংশই যায় শিল্প খাতে,এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। শিল্প উদ্যোক্তা মাত্রই ঋণ খেলাপি হবেন,এমন কোন কথা নেই। আবার ঋণ খেলাপি মাত্রই- শিল্প উদ্যোক্তা নন। যেহেতু ঝুঁকিবেশি নেন শিল্প উদ্যোক্তা,সেহেতু ঋণ খেলাপ হবার প্রবণতা বেশি। এই যা। শিল্প-বানিজ্য,শিল্প-ঋণ, শিল্প-ব্যাংক-“কারোরে ছাড়িয়া কারো নাহি বাঁচে প্রাণ”।
বর্তমান শিল্প বিপ্লবের যুগে,কোন সমাজই, কোন দেশই এখন আর শিল্পে পিছিয়ে পড়তে রাজী না। যে কারণে অর্থনৈতিক উন্নতি কল্পে বিশ্বের প্রতিটি দেশ শিল্পে বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ করে শিল্প গড়ে তোলে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে,আর্থ সামাজিক অবস্হার উন্নতি ঘটাতে। ব্যংক এবং ঝণ-এ শব্দ দু’টো একে অপরের পরিপূরক। ব্যাংক ছাড়া ঝণ হয় না। ঝণ মানে ব্যাংক। এই অর্ধ সত্যটা প্রায় সত্যের কাছাকাছি: বর্তমান ‘বিশ্ব ব্যাংক নির্ভর’ অর্থনীতির যুগে। ব্যাংক নেই, বর্তমান বিশ্বে এমন কোন দেশ নেই।
শিরোনামীয় বিষয় আলোচনায় আমি নতুন কিছু শোনাতে বা বলতে আসিনি। নতুন কোন কথা শোনাতে, বলতে পারবও না। এতদ বিষয়ে বিস্তর পন্ডিত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা অতীতে করেছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। আমি নতুন যে কাজটি করছি বলে,আপনাদের মনে হতে পারে,তা হল- আমি আমাদের কথা বলছি। যার মধ্যে সৃষ্টিশীলতা নেই, তিনি যেমন কবি না। তিনি যেমন শিল্পী না। তিনি যেমন সাহিত্যিকে না। তদ্রুপ শিল্প উদ্যোক্তামাত্রই সৃষ্টিশীল। সেটা আমাদের সুশীল সমাজ মানতে চান বা না চান। শিল্প উদ্যোক্তা মাত্রই মননে, চলনে, বলনে সৃষ্টিশীল। ধান বানা এবং শিবের গীত গাওয়া: একসঙ্গে মানিয়ে নেন, শুধুমাত্র শিল্পপতি।
শিল্প উদ্যোক্তা মাত্রই অতিশয় মিতব্যয়ি একজন মানুষ। কেন তিনি মিতব্যয়ী? কারণ তিনি মনে করেন-“এই অর্থ আমার না,আমাদের” এই কারণে। শিল্প উদ্যোক্তা সেই ব্যাক্তি, যিনি আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ। নিত্য নতুন আবিষ্কারেই তাঁর যত সুখ। কি পরলেন, কি খেলেন, কোন গাড়িতে চড়লেন- এহ বাহ্য। “আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাই”। ব্যতিক্রম আছে? কোথায় নেই? প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি: সমালোচনা শিল্প উদ্যোক্তার হবে। সমালোচনাকে, নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেও আবার, নেয়া যাবে না। কোন সৃষ্টিশীল মানুষই সমালোচনার উর্ধ্বে না।
কার্যকারণেই শিল্প উদ্যোক্তার সমালোচনা হবে। যেমন ভাবে, সমালোচনা হয় কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকের, রাজনীতিবিদের। মেনে নিতে হবে, সমালোচনাও একটি শিল্প মাধ্যম। অতএব, আলোচনা সমালোচনা হয় হউক। শের-ই-বাংলার ভাষায়-“আম গাছেই মানুষ ঢিল ছোঁড়ে, শ্যাওড়া গাছে না”। অতএব আলোচনা, সমালোচনায় একটুও মন খারাপ করা চলবে না। বিবেকের কাছে পরিস্কার থাকাটাই মূখ্য। বাকি “সকলই গরল ভেল”।
দুই.
শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে, আবার রপ্তানিমুখি শিল্প উদ্যোক্তা, হলে তো কথাই নেই। পণ্য উৎপাদন, বিপনন, পণ্যের মান নিশ্চিত করণ সহ নানান চতুর্মুখী কাজে,তিনি এত বেশি মগ্ন হয়ে থাকেন যে:
১.ক্রেতার খোঁজ, সংযোগ, দর কষাকষির পর পরিমান ও মূল্য নির্ধারণ।
২.এক্সফোর্ট এল.সি সংগ্রহ। বি.বি এল.সি খোলা।
৩.সকল পশ্চাদ পণ্য সংগ্রহ।
৪.ফ্যাব্রিকস উৎপাদন/সংগ্রহ।
৫.এক্সসরিজ সংগ্রহ/উৎপাদন।
৬.গারমেন্টস পণ্য উৎপাদনের সুষ্ঠ পরিকল্পনা।
৭.কর্মিবৃন্দকে ক্রেতার চাহিদা সম্পর্কে সচেতন করা।
৮.সময় মত সকল পণ্য গুদামজাত করা। যাতে ছোট একটি লেবেল এর জন্যও উৎপাদন ব্যহত না হয়।
৯.ক্রেতার স্হানীয় প্রতিনিধিকে চাহিদা মোতাবেক পণ্যের গুণ, মান ও পরিমানে সন্তুষ্ট করা।
১০.পণ্য সঠিক সময়ে নিরাপদে জাহাজীকরণ।
১১.এক্সপোর্ট এল,সি-তে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে ক্রেতার হস্তে পণ্য পোঁছানো।
১২.পরবর্তী শিপ মেন্টের পণ্য, লাইনে দেয়ার নিমিত্ত প্রস্তুত করা।
এই সকল কাজ নিপুণ ভাবে সম্পন্ন করা। বলাটা যত সহজ হয়েছে, করাটা ততোধিক কঠিন। সারাক্ষণ ফুলসিরাতের চুল সম, রজ্জুর উপর দিয়ে চলতে হয়। সামান্য বিচ্যুতি ডেকে নিয়ে আনে অসামান্য বিপর্যয়। উর্যুক্ত ক্রম: ঠিক ঠাক মেনে চলার জন্য যে নিষ্ঠা। তা অনন্ত কাল থাকে না। একটা সময়ে এসে খেই হারিয়ে যায়। আমাদের কর্মীবৃন্দ কাজ করেন ৮টা থেকে ৫টা। আর আমরা যারা শিল্প উদ্যোক্তা,তাদের কাজ ঘণ্টার গন্ডিতে বাঁধা যাবে? না। কেন?
কারণটা পরিষ্কার। কর্মীদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণাদি যোগান দিতে হয়। কর্মিদের বেতন-ভাতা যোগাতে হয়। পাড়ার মাস্তান ঠেকাতে হয়। পুলিশি ঝামেলা মেটাতে হয়। রাজনীতিবিদের মন রক্ষা করতে হয়। ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হয়।কাস্টমস এর লেঠা চুকাতে হয়। গোদের উগর বিষফোঁড় হলো ব্যাংক। এ্যাগো দুর্নিবার লালসা,নিবারণ করতে হয়।আর সরকার। এদিকে দেয়, ওদিকে নেয়,বানরের পিঠা ভাগে, ত্রাহি মধুসূদন !
অত:পর মনে হয় দিনটা ২৮/৩৬ ঘণ্টায় বর্ধিত হলে ভাল হত। এমান্ডমেন্ট যদি করা যেত,মহান আল্লাহর দরবারে। এত ব্যতি ব্যস্ততার পরেও মনের প্রশান্তি এই: “পরোয়ার দিগার আমার উসিলায়, এতগুলো লোকের রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন, শুকরিয়া”। এই চিত্র পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। এই চিত্র তৃতীয় বিশ্বের। নির্বিশেষে সর্ব শিল্প উদ্যোক্তার। এর আর কোন প্রকার রকম ফের নাই। ধ্রুব। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে- জেনে শুনে কেন আমি এ বিষ পান করলাম? কঠিনেরে কেন ভাল বেশে আলিঙ্গন করলাম?
উত্তরটা সোজা- “সকলে আমরা সকলের তরে, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে”। ছোট বেলার পাঠ্য, এই ভাব সম্প্রসারণ। সকল শিল্পপতি হৃদয়ে লালন করেন আমৃত্যু। বাইরের কঠিন আবরণটা সরালেই পেয়ে যাবেন আরাধ্য মানুষটিকে। প্রশ্ন উঠতে পারে বাইরে শিল্পপতির কঠিন আবরণ কেন? সেটা একটা রহস্য। কিছু রহস্য রহস্যই থেকে যাক না। ক্ষতি কি? কবির- কাঁধে খদ্দর ব্যাগ ভর্তি বই,পায়ে চপ্পল,উদাসী চাহনী, ভাবুক চিবুক। একটা রহস্য। রাজনীতিক দিগের- গুরু গাম্ভীর্য হাসতে মানা বদন,রাগী রাগী চেহারা,একটা রহস্য। থাক না।
বরং একটা গল্প বলি। ছোট বেলায় দেখেছি। আমাদের ক্ষেতের সব্জি বাজারে নিয়ে যেত,হারছের বাপ মামা। এই নামই জানি। তাঁর প্রকৃত নাম হারিয়েছে এই পথ চলতি নামের আড়ালে। আর এই-ই হয় মানুষ মাত্রেরই নিয়তি। মাননীয় মন্ত্রী। সচিব মহোদয়। অনারেবল প্রেসিডন্ট। শ্রদ্ধাভাজন সাহিত্যিক। মেয়র সাব। জনাব মেম্বর। উপাধি। বিশিষ্ট জনের। উপাধি পরিণত হয় নামে। আমজনতার এমনি বিশেষায়িত নাম হারছের বাপ। যা হোক বাজারে সব্জি বিক্রি করে আসার সময় কাধে করে,বাঁকের দুই পাশের দুই পাত্রে ভরে আনতেন,পার্শ্ববর্তী রেল লাইনের পাথর। প্রশ্ন করলে উত্তর দিতেন- “আরে ব্যাটা,কাঁধ খালি-খালি লাগে”।
আমাদের শিল্প উদ্যক্তাদের অবস্থাও কম বেশি তথৈবচ। উপর্যুক্ত চাপ ক্রমাগত তাকে,এমন ভাবে আবিষ্ট করে ফেলেছে যে,তিনি হয়ে গেছেন- নীল কণ্ঠ। কোন শিল্প উদ্যোক্তা স্বাভাবিক মৃত্যুর চিন্তা করেন না। তিলে তলে মরাই তাঁর নিয়তি। আজ হার্টে রিং পরানো। কাল বাইপাস সার্জারি। পরশু ষ্ট্রোক। তরশু হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যু। এটা যুদ্ধ ক্ষেত্রের মত। সেনাপতি নিহত। সেনাপতির পদ তো খালি থাকে না। আরেকজন এসে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। হয় মৃত্যুকে আলিঙ্গন,নয় বিজয়। এর যে কোন একটি অবধারিত জেনেও,যুদ্ধ ক্ষেত্রে সেনাপতির যেমন অভাব হয় না।
তেমনি শিল্প বানিজ্য যুদ্ধ ক্ষেত্রে কি শিল্প সম্প্রসারণ বন্ধ হয়েছে? হয়নি। শিল্প বিপ্লবের পর,শিল্প উদ্যোক্তার অভাব,কোন কালে দেখা গিয়েছে? না। প্রবল মনোবল শিল্প উদ্যোক্তার অমিত শক্তি। যদিও জানা অপরাপর যুদ্ধক্ষেত্রের মত,শিল্প-বানিজ্য যুদ্ধক্ষেত্রেও,উভয় পক্ষ কখনো ক্রমাগত জয়ী হয় না। যে কোন এক পক্ষকে সময় সাপেক্ষে পরাজয় বরণ করে নিতেই হয়। এটাই নিয়ম এবং নিয়তি। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ! এই উদয়াস্ত পরিশ্রমের ফল-ফসল হল উপহাস। কী সমাজ, কী সরকার, কী সুশীল সমজ সবাই তাঁকে কটাক্ষ করে শান্তি পায় ! যখন আপন মহিমায় উদ্ভাসিত তখন এক ভাবে। আর যখন আপন বলয় থেকে ছিটকে পড়েন তখন অন্য রূপে। মোট কথা স্বিকৃতি তাঁর কোন কালেই মেলে না। আত্মতৃপ্তি,আত্মতুষ্টিই সম্বল। আত্মস্বীকৃতির সম্বল, অবলম্বন করেই কণ্টকাকীর্ণ পথচলা।
“সম্রাটের ভাই নেই, বোন নেই, পিতা নেই, পুত্র নেই, বন্ধু নেই। তাঁর সাথী বলতে তাঁর তলোয়ার” (আইন-ই আকবরী, আবুল ফজল)। তদ্রুপ শিল্প উদ্যোক্তার সাথী তাঁর শিল্পিত মন আর শিল্প। এর কোন ব্যাত্যয় নেই। সমাজ সংসার তাঁকে তাড়িত করে।তিনি সকল চাপা বেদনা চেপে রেখে এগিয়ে যান। সামনে। আরো সম্মুখে। চলতে চলতে সমৃদ্ধ করে চলেন সভ্যতা। উৎপাদন করেন সভ্যতার উপকরণ। এতেই তাঁর মনে নির্মল আনন্দ,এটাই তাঁর জীবনানন্দ। সৃষ্টিশীল মানুষ মাত্রই সৃষ্টি করে যান,প্রাচুর্য তাঁর কর্মের অবধারিত ফলাফল। (চলবে)
লেখক- হারুন-অর-রশিদ মজুমদার
ঢাকা, বাংলাদেশ।







