আবুল মনসুর আহমদ। “আমার দেখা রাজনীতির পন্চাশ বছর” বইতে একটি গল্প বলেছেন। খুব ছোট বেলায় যখন ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ি সে সময়ে পড়া। পরে বইটি আর পাইনি। অনেক কাল আগে পড়া। ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু স্মৃতি থেকে যতটা মনে পড়ে, মোটামুটি এরকম। আতাউর রহমান খানের উদ্ধৃতি দিয়ে আবুল মনসুর আহমেদ বর্ণিত গল্পটি হলোঃ ধামরাই এলাকায় আতাউর রহমান খানের বাড়ি। সেখানে প্রবীণ পন্ডিত হরিপদ দাসের বাস। লোকজন যে কোন জটিল বিষয়ে পরামর্শের জন্য তাঁর দ্বারস্থ হত।

একবার হলো কি এক লোক একটা তালের বিচি খুঁজে পেলো রাস্তায়। ধামরাই এলাকায় নাকি তাল গাছ নেই। তাই লোকে চিনতে পারলো না- এইটা কি জিনিস। লোকজন সেটা নিয়ে গেলো হরিপদ দাসের কাছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন-“কি বিষয়”? লোকজন বলল-“এই জিনিসটার কূলকিনারা করতে পারছি না। তাই আসা”। হরিপদ দাস প্রথমে কাঁদলেন হাউমাউ করে। তারপর ঠাঠা করে হাসলেন। অতঃপর কিছুক্ষণ নিরবে কাঁদলেন। লোকজন তো এ দৃশ্য দেখে হতভম্ব। কাঁদা শেষে স্থিত হলে লোকজন বলল-“পণ্ডিত মশায় বিষয় কি”? হরিপদ দাস প্রশ্নের উত্তরে বললেন- “প্রথমে কাঁদলাম এই কারণে যে, এই সাধারণ একটি জিনিস তোরা চিনলি না। তোরা কতোটা বেকুব সেটা দেখে। দ্বিতীয় বার হাসলাম এই কারণে যে, জিনিসটা আসলে কি? আমি নিজেও চিনলাম না। তৃতীয় বার কাঁদলাম কেন? কাঁদলাম এই কারণে যে, আমি মরে গেলে তোদের কি হবে? সেইটা চিন্তা করে”।
আবুল মনসুর আহমদ গল্পটি যে কারণে উদ্ধৃত করেছেন আমি সে কারণে নয়। ভিন্ন এক কারণে উদ্ধৃত করলাম। আমাদের ব্যাংক গুলো বানরের পিঠা ভাগে লিপ্ত হয়েছে। গার্মেন্টস মালিক দিগের উদয়াস্ত শ্রমে অর্জিত। সমস্ত সম্পদ কি করে নিজেরা কুক্ষিগত করছে তা নিরবে দর্শন করে। “বিএবি”(ব্যাংক’স এসোসিয়েশন অব দ্য বাংলাদেশ) ও “এবি” (এসোসিয়েশন অব দ্য ব্যাংকার্স) এবং এনজিও গুলো বাংলাদেশের নব্য শোষক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। বৃটিশ আমলের জমিদার, মহাজন আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাবুলি ওয়ালাদের বর্তমান সংস্করণ এরা। “বিএবি” অনেকটা জমিদার দিগের সংঘঠন। “এবি” হছে নায়েব দিগের সংগঠিত রূপ। আমাদের “বিজিএমইএ”, “বিকেএমইএ” ও সাধারণ জনগণ সকলেই অদ্যাবধি। ধামরাই অঞ্চলের সেই তালের বিচির মতোই। এদের চৌকষ চৌর্যবৃত্তি চিনতে এবং বুঝতে অক্ষম হয়েছে। কেমন? তার বিস্তারিত বর্ণনা হাতে কলমে নিন্মে তুলে ধরছি।
একটি ক্রয়াদেশ ক্রেতার সাথে চুড়ান্ত করতে অনেক ঘষা-মাজা করতে হয় প্রতিযোগিতা মূলক বাজারে টিকে থাকার নিমিত্ত। ফ্যাক্টরিকে প্রায়শই COF(Cost Of the Factory), COP(Cost of the Product) হিসেব করে। নানান কায়দায় যেমনঃ CPM(Cost Per Minute), CMV(Cost Per Minute Value) কতো কি গবেষণা যে করতে হয়। কতোটা কম দামে ক্রেতাকে মান সম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করা যায়। ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হয়। ক্রয়াদেশ নিতে হয়। প্রতিযোগিতা মূলক বাজারে টিকে থাকার প্রয়োজনে অনেক সময় বিনা লাভেও ক্রয়াদেশ নিতে হয়। বিনা লাভ বললাম এই কারণে যে দরদাম করা কালে, উদাহরণ হিসেবে বলছিঃ
কোন একটি আইটেম নিয়ে ক্রেতার সাথে অনেক দর কষাকষি শেষে ক্রেতাকে বললাম $4.85 মূল্যমান আসে। মোটামুটি ২০% লভ্যাংশ হিসেব করে নিক্তির মাপে দেয়া মূল্যমান। ক্রেতাও অনেক নিচে থেকে দরদাম শুরু করে। অবশেষে বললেন, সর্বোচ্চ $4.00 দিতে পারবো। একদিকে ক্রেতা নাছোড়বান্দা। অন্যদিকে ক্রয়াদেশও প্রয়োজন। নচেৎ ওই সময়টাতে ফ্লোরে গ্যাপ পড়বে। মনে মনে ভাবলাম ঠিক আছে, ফ্লোর খরচ উঠুক। অনুরোধ করলাম ওকে কবুল, মাত্র $0.05 বাড়াও। অর্থাৎ $4.05 মূল্য দিতে বলাতে, ক্রেতা- ” Oh! My god! Five cents? তুমি ক্যাশ ইনসেনটিভ পাচ্ছো, সুতার দাম কমেছে”।
যেভাবে বলল- তাতে মনে হলো, এখনই হার্ট ফেল করে ফেলবে। যেন মাত্র $0.05 নয় তাঁর গাঁটের সব পয়সা আমরা ডাকাতি করে নিয়ে নিচ্ছি। মনে মনে বললাম, ক্যাশ ইনসেনটিভ না পেলে, সুতার দাম না কমলে বাড়িয়ে দিতে? দিতে না। যা হোক অবশেষে অনেক অনূনয়ের পর মেনে নিলো। চুড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হলো $4.05 কোনো লাভ ছাড়াই ক্রয়াদেশ নেয়া। এই হলো গার্মেন্টস এর কস্টিং। ক্ষুদ্র নমুনা, বৃহৎ নমুনা বলতে গেলে মহাকাব্য লিখতে হবে। মোটাতাজা ভলিউম দেখে পড়ার আগেই পাঠক হার্ট ফেল করে ফেলবেন। (চলবে…)







