দ্বিতীয় পর্ব ৫ এর পর…..

ছয়.
বলা হয়, “লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়”। কিন্তু গার্মেন্টসের লাভের গুড় খায় ব্যাংক। সুনির্দিষ্ট ব্যাংকিং আইনের মারপ্যাঁচের মাধ্যমে যেমন। আবার তেমনি হিমশীতল কক্ষের উচ্চস্তরের ব্যাংকারগণের অনির্দিষ্ট বেআইনী দুরবৃত্তায়নের মাধ্যমেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৃহত্তর গার্মেন্টস শিল্প খাত, ব্যাক্তিগত ভাবে গার্মেন্টস শিল্প মালিক। এই প্রবন্ধের বিভিন্ন পর্বে, ব্যাংকিং দুর্বৃত্তায়ন ও ব্যাংকিং মারপ্যাচ অনুপুঙ্খ তুলে আনবো ভিন্ন ভিন্ন কেস স্টাডির মাধ্যমে। প্রথমে এই তৃতীয় পর্বে দেখাবো স্থুল বেআইনি দুরবৃত্তায়ন। তৎপরবর্তী পর্বে তুলে ধরবো সুক্ষ্ম গাণিতিক হিসাব নিকাশের মাধ্যমে আইনি দুর্বৃত্তায়ন- নিজে একজন গার্মেন্টস মালিক এবং অর্থনীতি(সম্মান)-র সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে। অনেকেই আশ্চর্য হয়ে যান, দেশে এতো ব্যাংক কেন? যে পরিমান কোট, টাই, স্যুটেট, বুটেড হিম শীতল কক্ষের ভদ্র জনোচিত ধান্ধা! হবে না ই বা কেন?

আমাদের দুর্বল হয়ে যাওয়া গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী গুলো, স্থিত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী গুলো, প্রধানত ব্যাংকিং নানা আইনী বেআইনী দুস্কাকার্য, দুর্বৃত্তায়নে দুর্বল ও স্থিত হয়েছে। বিজিএমইএ এর দুই তৃতীয়াংশ সদস্য সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে বিগত কয়েক বছরে। এই প্রবন্ধের কাজটি করতে যেয়ে আমি প্রত্যক্ষ করেছি যে, বেশ কয়েকটি কার্য কারণের মধ্যে প্রধানত ব্যাংকিং জটিলতায়ই প্রায় নব্বই শতাংশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী দুর্বল বা স্হিত হয়েছে। বিজিএমইএ সদস্য, একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী মালিকের, উত্তম পুরুষের বয়ানে, ব্যাংকিং জালিয়তির দৃষ্টান্ত স্বরূপ, এখানে একটি নমুনা উপস্থাপন করছি।

কেস স্টাডিঃ
সী মস নিটওয়ার লিমিটেড শ্যাওড়া পাড়া, মিরপুর, ঢাকা। একটি রপ্তানীমুখী নন কম্প্লায়েন্স গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান।২০১৩ সনে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর রাতারাতি ক্রেতা সমস্ত ক্রয়াদেশ বাতিল করলেন। নন কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরী -এই আলোকে। তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী মূলতঃ নন কমপ্লায়েন্স। কমপ্লায়েন্স বিষয়টির জোর তৎপরতা রানাপ্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী কালের। যাহোক, এখন কি উপায়? ক্রেতার সাথে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। তাই উপায় ক্রেতাই বাতলে দিলেন- যে কোন রুগ্ন অথচ কমপ্লায়েন্স মানের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী পেলে টেকওভার করুন, খোঁজ করুন, পাবেন।

খোঁজ পেলাম গাজীপুরের কালিয়াকৈরের নাওলায় অবস্হিত রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত আর এফ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রীজ লিমিটেড এর। আমি টেকওভার করলাম রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর রুগ্ন এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি। এ যে ছিলো এক ধুরন্ধর, লোভাতুর ব্যাংকার চক্রের একটা পাতা ফাঁদ তা এমন:

রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর জনতা ভবন শাখার তৎকালীন মহা-ব্যবস্হাপক জনাব গোলাম ফারুক পরবর্তীকালে ডি.এম.ডি রাষ্ট্রায়ত্ব বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, তারও পরে এম.ডি রাষ্ট্রায়ত্ব রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। আমার প্রদেয় প্রস্তাবে প্রবল আগ্রহ দেখালেন। আমিও উৎফুল্ল হলাম, তার আন্তরিকতা ও সর্বাত্মক সহযোগীতা দেয়ার আশ্বাসে।

রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর তৎকালীন ডি.এম.ডি, পরবর্তীকালে এম.ডি জনাব আব্দুস ছালাম আজাদ যিনি জনাব গোলাম ফারুক এর অব্যবহিত পূর্বে রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর জনতা ভবন শাখার মহা-ব্যবস্হাপক ছিলেন। এই আর এফ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রীজ লিমিটেড কান্ড যে এই গোলাম ফারুক ও আব্দুস ছালাম আজাদ উভয়ের একমহা জটিল ও কুটিল চক্রান্ত-তা বুঝতে আমার সময় লেগেছিল বছর দুয়েক। দুদক এর কমিশনার জনাব সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এর দুদক থেকে, তার কার্যকাল ফুরানোর সময় পর্যন্ত। সে আরেক ইতিহাস।

বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারীতে জড়িয়ে জনাব আব্দুস ছালাম আজাদ এর নাম উঠে আসে দুদকের খাতায়। তিনি তখন রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর জনতা ভবন শাখার মহা-ব্যবস্হাপক। এই সময়েই রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর জনতা ভবন শাখায় জমা হয় দুদক কমিশনার জনাব সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট আর এফ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রীজ লিমিটেড এর। দুদকের কমিশনার জনাব সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তাকে অর্থাৎ জনাব আব্দুস ছালাম আজাদকে প্রস্তাব দেন, যদি তিনি আর এফ টেক্সটাইল ইন্ডস্ট্রীজ লিমিটেড এর প্রজেক্ট লোনটি সেংশন করে দেন, তবে দুদকে আসা তার অর্থাৎ আব্দুস ছালাম আজাদ এর নাম বিবেচনা করবে দুদক। এই কার্য কারণের ফসল হলো গাজীপুরের আর এফ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কাজেই লোন সেংশন হয় জনাব আব্দুস ছালাম আজাদ এর প্রভাবে এবং জনাব আব্দুস ছালাম আজাদ এর সকল অপকর্মের সহযোগী ও ভাগীদার তৎকালীন এম ডি জনাব আমিনুল হক এর চাতুর্যে ও সংশ্লিষ্টতায়। দুদক এর অভিযোগ থেকে জনাব আব্দুস ছালাম আজাদ এর নাম অপসারণের শর্ত সাপেক্ষে।

এই প্রভাবশালী সংশ্লিষ্টদিগের প্রজেক্টে যা হয়, এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। ব্যাপক নয়-ছয় হয়। আমি টেকওভার করার সময় নয়-ছয় হওয়া সকল দায় তো নিলামই, নতুন করে আশুলিয়া জোনের নিজ নামীয় উচ্চ দামী ৪১ শতাংশ জমিও মর্টগেজ দিলাম। নগদ টাকা দিলাম- ডাউন পেমেন্ট বাবদ এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত, কম্প্রমাইজিং এমাউন্ট বাবদ আরও দুই কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দিলাম। অন্যদিকে আর এফ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর পূর্ব ম্যানেজমেন্ট যতোই দায় সৃষ্টি করুক না কেন, তাদেরকেও জেন্টলম্যান কমিটমেন্ট হিসেবে,ডিড এগ্রিমেন্ট করে এক কোটি টাকা দিলাম। এই সর্বমোট বিনিয়োগ পাঁচ কোটি টাকা। শাখা মহা-ব্যাবস্হাপক জনাব গোলাম ফারুক আশ্বাস দিলেন, আমি এই রুগ্ন শিল্পের উত্তোরণে,পুনঃ অর্থায়ন সহ যা যা চাইছি তার সবই তারা পূরণ করবেন। তবে তা হবে রুগ্ন শিল্পটি টেকওভারের পরে। ব্যাংকিং আইন কানুনের বাধ্যবাধকতার কারণেই। পুনঃ অর্থায়নের নিমিত্ত। আমার চাওয়া গুলি ছিল:
১. বিদ্যমান ৩ তলা ভবনটিকে ৬ তলা ভবনে উত্তীর্ণ করা।
২. বিদ্যমান ১৮৪টি সুইং মেশিনকে ৬০০ মেশিনে উত্তীর্ণ করা।
৩. বিদ্যমান ১৪টি নিটিং মেশিনকে ৫০ সংখ্যায় উত্তীর্ণ করা।
৪. কয়লা ভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ একটি ডাইং সেকশন প্রতিস্হাপন।

প্রথম ধাপে এটুকুই ছিল আমার চাওয়া। তাঁরাও স্বীকার করলেন- এটা যৌক্তিক। এই পূণঃ অর্থায়ন না হলে প্রকল্প যথাযথ কর্মক্ষম হবে না। নচেৎ পুনর্বার মুখ থুবড়ে পড়বে। সেই মতো রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংক লিমিটেড জনতা ভবন শাখার মহা-ব্যবস্হাপক জনাব গোলাম ফারুক শাখা ক্রেডিট কমিটি পাশ করালেন। মোট বর্ধিত প্রকল্প ব্যয় ৫১৫৪.৮১ লক্ষ টাকার উপর ৬০ঃ৪০ ঋণ সম মূলধন অনুপাতে ৩০৯২.৮৯ লক্ষ টাকার দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প ঋণ(বি এম আর ই) মন্জুরীর। তারপর ফুড়ৎ।
কেন?

(চলবে)