তিন.
সকল উদ্যোক্তাই কি ক্রমাগত সাফল্য লাভ করতে থাকেন? নাহ্ ! বিফলও হন। হতেই হয় । বিফল হবার পেছনে থাকে। অনেক কার্যকারণ- ব্যাংক, ক্রেতা, কর্মকর্তা, কর্মি, কত কী ! দায় শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তার একার। তাঁর সাফল্য যখন আসে তখন, নিরাপত্তা প্রহরী থেকে আরম্ভ করে ই.ডি পর্যন্ত, সকলেই এ সাফল্যের হক দাবি করে। যাবতীঁয নিজ সুবিধাদি আদায় করে নেন অতীব সুকৌশলে। আর যখন দুর্দিন ঘনিয়ে আসে সকলেই পগার পার। দু:খ তাঁর একার। সুখ সবার। কোন শিল্প উদ্যোক্তারই এ নিয়ে কোনই আক্ষেপ থাকে না। ভ্রুক্ষেপও নেই,এমনই হয়,এমনই হবে,তাঁর জানা। বিরূপ এ পরিস্হিতির জন্য,মানসিক প্রস্ততি থাকে বিধায়,তিনি মুষঢে পড়েন না।

তাঁর সুসময়ে ব্যাংক তাঁর পদতলে বসে, মিউ মিউ করত। সাপ্লায়াররা মোসাহেবির যত কায়দা কানুন আছে তার সবই প্রয়োগকরত। ক্রেতা কম দামে পণ্য বানিয়ে নিতে কত কলা কসরত করেছে। দু:সময়ে, যে যার মত করে সটকে পড়ে। ব্যাংক তার লগ্নি আদায়ের নিমিত্ত,হেন কোন কর্ম নেই যা করে না। প্রাপ্য অর্থের বহুগুণ বাড়িয়ে,বাস্তবতা বিবর্জিত মামলা-মোকদ্দমা দায়ের। কোর্ট-কাছারী তো করেই। থানা-পুলিশ,পুলিশী হয়রানি,হেনস্হা। সবই করে।

কর্মীরা তাদের পাওনা পরিশোধের জন্য- ভাঙচুর, লুটপাট, জালাও,পোড়াও চালাতে থাকে। নেয় যেন, পোড়া মাটি নীতি। অথচ এই কর্মীরাই যখন ফ্যাক্টরীতে ভরপুর কাজ ছিল,তখন নানা উছিলায় তারা,উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ করেনি। পণ্যের মান ঠিক রেখে পণ্য উৎপাদন করেনি। যে কারণে কখনো ডিসকাউন্ট,কখনো অর্ডার ক্যানসেলেসনের মুখোমুখি হয়ে,ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। বার বার সতর্ক করার পরও,পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নের তোয়াক্কা তারা করেনি।

তথাকথিত শ্রমিক নেতাদিগের উস্কানীতে এখন বলে,পাওনা বেতন-ভাতাদি পরিশোধ কর। লে অফ পরবর্তী তিন মাসের বেতন দাও,বিতর্কিত শ্রম আইন মেনে। যে আইন পক্ষপাত দুষ্ট। চাপের মুখে পরিশোধিত,বেতন-ভাতার বৃহদাংশ যায়, অন্তরালের এই তথাকথিত শ্রমিক নেতাদিগের পকেটে। বৈধ কি অবৈধ সেটা অমীমাংসিত। আইন এখানে অন্ধ। তবে এটা তথাকথিত শ্রমিক নেতাদিগের আয়ের প্রধান উৎস। স্বীকৃত সত্য। মগের মুল্লুক আর কী !

কর্মকর্তাগণ অজস্র কাঁচামাল লোপাট করেছে। অপচয় করেছে নতুন কাঁচামাল ক্রয়ে। কমিশন বানিজ্য করেছে সাপ্লাইয়ারের সাথে মিলে-মিশে। কর্মীদেরকে উস্কানী দিয়ে অরাজকতায় ইন্দন যোগাচ্ছে। ইতিমধ্যেই কোন কোন কর্মকর্তা লুটপাটের টাকায়,নিজেই তলে তলে শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক বনে গেছে। এই কর্মীদেরকেই তার নব্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়েছে। ক্রেতাকে তার নতুন সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানে ক্রয়াদেশ দেয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। হয়ে উঠছেন নব্য শিল্প উদ্যোক্তা।

ক্রেতাও ভিড়ে যাচ্ছেন সাবেক কর্মকতা,বর্তমান উদ্যোক্তার সাথে। যেহেতু ইনি তার চাহিদা ও পণ্যের মান বোঝেন। পাশাপাশি এই কর্মকতার দুর্নীতির সাক্ষী কিছুটা ক্রেতাও। কাজে কাজেই তার থেকে,কিছুটা অন্যায় আবদার তিনি, আদায় করে নিতে পারবেন অনায়াসে। যেমন, সি এম কম দিবেন,ফ্যাবরিক্স তিনিই সাপ্লাই দিবেন,এক্সসরিজও সাপ্লাই দিবেন। আর, এসব সাপ্লাইয়ের বিপরীতে বেশি বেশি দাম দেখিয়ে,বি.বি এল.সি নিয়ে নেবেন। অন্যদিকে এক্সপোর্ট এল.সি ট্রান্সফারের সময়। যথারীতি নিয়মানুগ বায়িং কমিশনের ব্যাংক এন্ড্রোস তো আছেই। এতে বিসমিল্লায়ই তাঁরও ধ্বংসের বীজ বপন হলো। কেনাতেই লস,বেঁচায় লাভ হা হতোস্মি। নতুন উদ্যোক্তা। নতুন অধ্যায়। পতঙ্গ যেমন ধেয়ে যায় দ্বীপ শিখার দিকে,তদ্রুপ শিল্পের দিকে ধেয়ে যায় নব শিল্পপতি।

এক কথায় শিল্প উদ্যোক্তা একদিকে ডোবে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা নিজ নিজ আখের গোছাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। কারো ঘর পোড়া যায়,কেউ কেউ আলু পোড়া দেয়। হরিলুটের মহোৎসব আর কাকে বলে? নদীর এ কুল ভাঙে,ও কুল গড়ে ! এই ভাঙা গড়ায় নিস্পেসিত কত মহাপ্রাণ।

এই ভাঙা আর গড়ার ফলাফল: ঝণ খেলাপির তকমা। ব্যাংক কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়। ব্যাংক বিনিয়োগ করে শিল্প প্রতিষ্ঠানে,নির্দিষ্ট অংকের সুদ নামক লভ্যাংশের বিনিময়ে। শিল্প উদ্যোক্তা যেকোন কার্যকারণেই হোক,যখন ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হন। তখনই ব্যাংককে তার পাশে পাওয়ার প্রয়োজন বেশি অনুভব করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ব্যাংক যদি তখন পাশে না দাঁড়ায়,তখনই ঘটে চরম বিপর্যয়।

আর যদি বিপর্যয় ঠেকাতে,এগিয়ে আসে ব্যাংক। তখন সামগ্রিক পরিস্হিতির চিত্র হয় ইতিবাচক। এমত অবস্হায় শিল্প উদ্যোক্তা যেন,মরূদ্যানের খোঁজ পান ব্যাংকের মাঝে। এইটা হওয়াটা কাম্য। অথচ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, এমন দৃশ্য গোচর হয় কদাচিৎ। যেমনটা স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ক্ষেত্রে হয়েছে। পারতপক্ষে। বিরূপ পরিস্হিতিতে ব্যাংকের পিঠটান দেয়াই হয় হরহামেশা। যা আদৌ কাম্য নয়।

এখন শিল্প বিপ্লবের স্বর্ণযুগ সারা পৃথিবীময়। শিল্প সম্প্রসারণ থেকে পিছু হটা মানে পিছিয়ে পড়া। নিত্য নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোনই বিকল্প নেই। এটা যেমন সত্য। তেমনি সত্য বিদ্যমান শিল্পের আধুনিকায়ণ। বিদ্যমান শিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে এই কারণে যে, আমরা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছি।

যেমন ধরুন, আমাদের গার্মেন্টস শিল্প। বিগত কয়েক দশকে। এ শিল্প আমাদের সমৃদ্ধি যেমন এনে দিয়েছে। তদ্রুপ শিল্পও সমৃদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ বিগত চার দশকে:
১.গড়ে উঠেছে এক বিপুল দক্ষ জনশক্তি। প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ মিলিয়ে। প্রায় এক কোটি।
২.গড়ে উঠেছে শিল্পের সৌষ্ঠব বা অবকাঠামো। প্রায় তিন হাজার। সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের।
কাজেই আমরা নতুন শিল্প পণ্যের খোঁজ যেমন করব। পাশাপাশি এই গার্মেন্টস শিল্পকে। আরো এগিয়ে নিয়ে নেবার প্রকল্প হাতে নিব।

চার.
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন,শিল্পকে বহুমুখী করতে হবে। আবার বিশেষজ্ঞদের অনেকে,একমুখী শিল্পায়নের পক্ষপাতী। উভয় পক্ষের কাছে স্ব স্ব মতের পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে নি:সন্দেহে। বাস্তবতার নিরিখে আমাদের পথ আমরাই বেঁছে নিব। আমরা উভয় মতকে গ্রাহ্য করে,উভয় মতের সমন্বিত পন্হা বেছে নিব। অর্থাৎ আমাদের একমুখী গারমেন্টস শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে ইলেকট্রনিক্স,
আই.টি, চিংড়ি, চামড়া খাতকেও এগিয়ে নেব বিকল্প শিল্পায়ন হিসাবে,এগুলো থাকবে হাতের পাঁচ।

সর্বপ্রধান শিল্পখাত থাকবে গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদন। অন্যান্য অনেক কার্যকারণের মধ্যেও এই খাতকে বেছে নেওয়ার প্রধানকারণ দু’টো:
১.এই শিল্প শ্রমঘন। যেহেতু আমাদের পর্যাপ্ত জনবলই আমাদের বাহুবল। সেহেতু এই শ্রম শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, সমৃদ্ধির পথে রপ্তানীমুখী গার্মেন্টস শিল্পের উত্তরণ ঘটাতে হবে।
২. গার্মেন্টস শিল্পে প্রায় ৭০ ভাগ কর্মী- নারী। আমরা যুবকদের মত,যুবা নারীদের বিদেশে পাঠিয়ে দেখেছি,তাঁরা সেখানে নিরাপদ না। বরং গার্মেন্টস শিল্পে তাদের চাহিদাও আছে,আর এটা তাদের পরীক্ষিত নিরাপদ কর্মক্ষেত্রও। কাজেই গার্মেন্টস শিল্পকেই আমাদের প্রধান খাত হিসাবে প্রাধান্য দিয়ে,এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত,এতে করে আমরা বিশ্বে শুধুমাত্র গার্মেন্টস পণ্যের দেশ হিসাবে উপাধি পেয়ে যাব। তাতে কি ক্ষতি? এতে ক্ষতির চেয়ে লাভের পাল্লা-ই বরন্ছ ভারী হবে বেশি। যে সর্ব বিষয়ে পারদর্শী সে পারত পঁক্ষে কোন বিষয়েই ভাল জানে না। ইংল্যান্ড শিক্ষা খাতে,সিঙ্গাপুর চিকিৎসায়,জাপান অটোমোবাইলে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ইলেক্ট্রনিক্সে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্পে,বিশেষায়িত দেশ।

আমরা বিশ্বের গার্মেন্টস এক্সপার্ট হিসাবে যদি প্রসিদ্ধী অর্জন করি। বিশেষজ্ঞের খ্যাতি অর্জন করি,তা নিয়ে কুন্ঠিত না হয়ে,গর্বিত বুক চিতিয়ে বলতে হবে- “আমরা বিশ্বের সেলাই ঘর। যে মানুষ পৃথিবীকে সাজায়,সে মানুষকে সাজায় পোষাক। আর আমরা সাজিয়ে তুলি পোষাককে। প্রকারন্তরে মানুষকে,প্রকারান্তরে পৃথিবীকে”।

এই হল গার্মেন্টস শিল্পের মূল মাহাত্ম্য। এই শিল্পের প্রেমে পড়ে,এই শিল্পের সাথে নিজের ভাগ্যকে জড়িয়ে। হাতে গোণা অনেকে নিজের অজান্তেই হয়েছেন,বিপুল বিত্তের জিম্মাদার। মুদ্রার অপর পিঠে অজস্র উদ্যোক্তা হয়েছেন- নি:স্ব। রিক্ত হস্ত। অন্যদিকে অর্থ বিত্তের জিম্মাদারগণ,কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রযন্ত্রেরও ক্রীড়নক। কেউ হয়েছেন রপ্তানী শিল্প সমিতির দেশবরেণ্য নেতা। কেউ কেউ নেতা থেকে,শিল্প সেক্টরের নিয়ন্তা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যাদের ভোটে নিজেদের উত্থান,সেই সাধারণ সদস্যদের দু:সময়ে থেকেছেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

যার ফলাফল বছর ওয়ারি, নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত হয়েছেন। গাণিতিক হারে। কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছেন কত না আদি উদ্যোক্তা জ্যামিতিক হারে। অথচ রপ্তানীর পরিমান কিন্তু বেড়েছে,বৈষম্য প্রকটতর হওয়ার,জলজ্যান্ত নিদর্শন। সবল উদ্যোক্তাদের,ইউনিট সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। পরিসংখ্যান এবং বাস্তবতা এটাই বলে। সরকারের নজর এক্ষেত্রে নজরদারীর পর্যায়ে থাকেনি। সরকার যদি এক্ষেত্রে সুসম তদারক করতেন গণচীনের মতো। তবে, পরিস্হিতি অতোটা অসম হতো না।

( এখানে বিজিএমই-এর বর্তমান, অতীত সদস্য ও রপ্তানীর পরিসংখ্যান দেয়া হলো )
সাল সদস্য সংখ্যা। রপ্তানীর পরিমান
২০০০-২০০১ ৩২০০ $৪৮২৪.৭১
২০০৫-২০০৬ ৪১০৭ $৬৯০০.০৮
২০১০-২০১১ ৫০৬৩ $১৪৮৫৪.৬০
২০১৫-২০১৬ ৪২৯৬ $২৬৬০২.৭০
২০১৯-২০২০ ৪৬২১ $৩৩০৭২.৩৮
২০২০-২০২১ ২৩১৪

(কোটি ইউ এস ডলার)
( তথ্য সূত্র: রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো-র রপ্তানী পরিসংখ্যান এবং বিজিএমইএ প্রদত্ত সদস্য পরিসংখ্যান একত্রীকরণের পর উদ্ভূত সারণি )

বিজিএমইএ প্রদত্ত সদস্য পরিসংখ্যানে,একটি শুভঙ্করের ফাঁক কিন্তু আছে। কিছু আছে বিজিএমই-এর স্হিত সদস্য, আর বেশকিছু ফ্যাক্টরী,খুবই নগন্য পরিমান রপ্তানী করেন। উপর্যুক্ত পরিসংখ্যানের,বৃহৎ অংশই নিয়ন্ত্রন করেন,কতিপয় বৃহৎ শিল্পগ্রুপ। একাবিধ, বহুবিধ নামে।

দুর্বল হয়ে যাওয়া ফ্যাক্টরী গুলো সচল থাকলে,এক দশক আগে নির্ধারণ হওয়া,ভিশন ২০২০-র রপ্তানী টার্গেট,৫০ বিলিয়ন ডলার,আজ ৩০-৩৩ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ থাকত না। ৫০ বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে,রপ্তানী বানিজ্যের জোয়ারই ছিল স্বাভাবিক।কারণ অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতাই,আজকাল পণ্য ক্রয়ে বিকল্প দেশ পেলে,চায়নামুখী হতে চায় না।

বিপরীতে বিশ্বের সব দেশের ক্রেতাগণই,আমাদের তৈরী পণ্যের গুণে-মানে অত্যন্ত পরিতৃপ্ত। আমাদের মালিক-শ্রমিকের নিষ্ঠায়, আতিথ্যে, আনুগত্যে তারা সন্তুষ্ট। আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা কম। তাই কার্যাদেশের পরিমান তারা ইচ্ছে থাকা সত্বেও বাড়াননা। যেহেতু পরিসংখ্যানই বলে,আমরা বিশ্বের গার্মেন্টস রপ্তানী বানিজ্যের,আজ পর্যন্ত মাত্র ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রন করি। যেখানে বছর ওয়ারী বৈশ্বিক পোষাক বাণিজ্য হয় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের।

অথচ অচল আলোচ্য ফ্যাক্টরীগুলো সচল থাকলে, আন্তর্জাতিক গার্মেন্টস রপ্তানী বানিজ্যের হিস্যা ১০ শতাংশে ক্রমান্বয়ে উন্নীত করা হত,একেবারেই মামুলি ব্যাপার। আর তা-ই যদি হত,তাহলে ১০ শতাংশ হিস্যায় ২০২০ সনে আমাদের গার্মেন্টস রপ্তানী বানিজ্য এখন হত ৬৫-৭০ বিলিয়ন ডালারের। আমাদের পশ্চাদপদতার সুখ,উপভোগ করছে- চায়না,ভিয়েতনাম,তুরস্ক।

৬৫-৭০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানী বানিজ্য হতো অনায়াসে। যেহেতু আমেরিকা ইউরোপ সহ বিশ্বের সব দেশের ক্রেতারই উপর্যুক্ত দেশ গুলোর বিকল্প হিসাবে,বাংলাদেশেকেই বেশি পছন্দ। শুধু তা-ই নয় তুরস্ক, চায়নাও কিছু কিছু পণ্য তৈরী করতে,এখন আর নিজেরা আগ্রহী নয়,তাদের শ্রম বাজারে মজুরী বৃদ্ধি পাওয়াতে। বরং অনেক তুরস্ক, চায়না ক্রেতাই তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য,সেসব পণ্য ইতোমধ্যে আমাদের দেশ থেকে বানিয়ে নিতে,আগ্রহ পোষণ করছে। ক্রয়াদেশ দিচ্ছে। রপ্তানীও হচ্ছে।

পাঁচ.
তাহলে প্রতীয়মান হচ্ছে,বিশ্বের বানিজ্য মোড়ল চায়না কিন্তু আমাদেরকে,প্রতিদ্বন্দ্বি না ভেবে সহযোগী ভাবছে। এটা ইতিবাচক। এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্যারামিটার উঠানামাটা স্বাভাবিক ঘটনা। আর তাই গণচীনের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বহাল থাকতে থাকতেই, আমরা বিপুল জনসংখ্যার দেশ চায়নার সাথে,গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানী করেই,বিদ্যমান অসম বানিজ্যের বৈষম্য,কিছুটা হলেও হ্রাস করতে পারি। বর্তমান অবস্হায় অন্য কোন খাত দিয়েই,চায়নার সাথে আমাদের অসম বানিজ্যের এই ঘাটতি ঘুছিয়ে আনা সম্ভবপর নয়।

এতে করে কাজের কাজ যেটা হবে তা হলো, কলাও বেঁচা হলো রথও দেখা হলো। অর্থাৎ একদিকে পূর্বে চায়নায় তৈরী হওয়া পণ্যের,বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ বর্তমানে আমরা তো পেলামই,পাশাপাশি চায়নার অভ্যন্তরীন বৃহৎ বাজারও, আমাদের করতলগত হয়ে গেলো। চায়না স্বেচ্ছায় দিলো। আন্তর্জাতিক বানিজ্য শুধু নয়,আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এইটি মাইল ফলক হবে,বাংলাদেশের বিদ্যমান সরকারের জন্য।

আর এটা সম্ভব শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেই,অন্য কোনই বিনিয়োগ না করেই। অর্থাৎ বর্তমানে অচল ফ্যাক্টরীগুলো সচল করার মধ্য দিয়েই সম্ভব,এই সম্ভাবনার হাতচানিকে আমাদের করায়ত্ব করা। এতে করে খুশি চীনা বিক্রেতা-ক্রেতা। খুশি, ভীন দেশি ক্রেতা। খুশি, দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তা। যেহেতু অতীত বানিজ্যের জেরে,এদের মধ্যে ত্রিমুখী সম্পর্ক আজো অটুট। তাই, অতীতে হয়নি বলে, বর্তমানে বা অদুর ভবিষ্যতে এই নানা কারণে বন্ধ হওয়া, ফ্যক্টরী গুলো সচল হবে না,এটা আমি বিশ্বাস করি না।

এতদ বিষয়ে রপ্তানী শিল্প সমিতি। যে সংঘ, সকল সভ্যের মূখপাত্র। ভূমিকা নিতে পারতেন। সরকারের সাথে, বাংলাদেশ ব্যংকের সাথে,বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের সাথে,শিল্প মন্ত্রনালয়ের সাথে,অর্থ মন্ত্রনালয়ের সাথে,সমন্বিত একটি সময়োপযোগি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে,তাঁরা ইচ্ছে করলেই পারতেন। যেহেতু- সরকার,সরকার প্রধান,যখন যিনিই হয়েছেন,প্রত্যেকেই রপ্তানী খাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। দিচ্ছেন। এমনকি আন্দোলন সংগ্রামে। বিরোধী দলও, রপ্তানী খাতকে চার দশক ধরে,তাঁদের সকল কর্মসূচির আওতা বহির্ভূত রেখেছেন,রীতিমত পত্র পত্রিকা,ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দিয়ে। জনগণেরও সহানুভূতির কমতি নেই রপ্তানী খাতে। “চাচা আপন পরাণ বাঁচা” ধাঁচের রপ্তানী শিল্প সমিতি। যে সংঘ, সকল সভ্যের মূখপাত্র। হস্তী’র মতই নিজ ব্যাপ্তী,নিজ বিস্তার,নিজ সক্ষমতা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। দু:খজনক।

এই যে রপ্তানী শিল্প সমিতির দায়িত্বহীনতা,এতে যে
কেবলই সাধারণ শিল্প মালিকগণ,ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা কিন্তু না। রপ্তানী শিল্প সমিতির নিয়ন্তা,অনেক বড় বড় শিল্পগ্রুপও রাতারাতি ধ্বসে পড়েছেন। কাজে কাজেই সাধারণ শিল্প মালিকগণ,এ ধ্বসে পড়া অনেকটা উপভোগই করেছেন। বলা চলে লোকালয় যখন পোড়ে,দেবালয়ও রক্ষা পায় না। অবশ্য এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার রাজনৈতিক মতাদর্শও নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। আর এ কারণেই রাজনীতিবিদেরাও বিষয়টি উপভোগ করেন।

কয়েকটি স্বনামধন্য সম্পূর্ণ অথবা আংশিক বন্ধ শিল্প গ্রুপের মেশিন সংখ্যা সমেত তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলো। মেশিন সংখ্যা দেয়া হলো এ কারণে যাতে শিল্প গ্রুপ গুলোর, উৎপাদন সক্ষমতার একটি সম্যক ধারণা লাভ হয়:

গ্রুপ মেশিন সংখ্যা(আনু:)
সিনহা গ্রুপ ৩৫ হাজার
গিভেন্সী গ্রুপ ২৫ হাজার
আননটেক্স গ্রুপ ১৫হাজার
হলমার্ক গ্রুপ ১৫হাজার
জজ ভূঁইয়া গ্রুপ ১৫হাজার
বিশ্বাস গ্রুপ ১০ হাজার
আলানা গ্রুপ ১০ হাজার
ইস্ট ওয়েস্ট গ্রুপ ১০ হাজার
চৈতি গ্রুপ ৫ হাজার
চৌধুরী গ্রুপ ৫ হাজার
সাথী গ্রুপ ৫ হাজার

নমুনা মাত্র। সত্যিকার পরিস্হিতি আরো ভয়ানক। যা তুলে আনা নিষ্ঠাবান গবেষকের দ্বারাই সম্ভব। এই শিল্প গ্রুপগুলো একসময় ছিল ক্রেতা, কর্মী, কর্মযজ্ঞে,প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর, চারিদিক কর্মমুখর,কর্মীদের কোলাহল। অথচ, আজ নিথর। নিরব।১০০ থেকে ১,০০০ মেশিনের তিন সহস্রের অধিক ফ্যাক্টরী,আজ অনুরূপ ম্রিয়মান,হিমশীতল,সুনসান।
(চলবে)