সিরাজুর রহমানঃ চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার মুখেও তুরস্কের অর্থনীতি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। মূলত দীর্ঘ আট বছর পর তুরস্কের সেন্ট্রাল ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ ১২৮ বিলিয়ন ডলারের সীমাকে অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে বিগত ২০১৯ সালের পর চলতি ২০২২ সালে অবিশ্বাস্যভাবে রের্কড পরিমাণ আয় এসেছে বৈদেশিক পর্যটন নির্ভর শিল্পখাত থেকে। তুরস্ক চলতি ২০২২ সালের শেষ পর্যন্ত ৩৮ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে বলে আশা করছে।
তাছাড়া তুরস্ক রাশিয়া থেকে একেবারে কম দামে জ্বালানি তেল ক্রয় করে তা আবার আন্তর্জাতিক বাজার দামে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। যা দিয়েই কার্যত দেশটির ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবশ্য ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তুরস্কের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১১৫.১৪ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২২ সালের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত তুরস্ক মোট ২.০০ বিলিয়ন ডলার সামরিক সাজ সরঞ্জাম এবং সিভিল অ্যারোস্পেস সিস্টেম রপ্তানি করে আয় করেছে এবং ২০২২ সালের ২১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪.০০ বিলিয়ন ডলার আয় করার বিষয়ে প্রবলভাবে আশাবাদী তুরস্কের এরদোয়ান সরকার। তাছাড়া গত ২০২১ সালে দেশটি সামরিক সাজ সরঞ্জাম ও সিস্টেম রপ্তানি করে ৩.২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল।
তবে ২০২০ সাল থেকে চলা করোনা মহামারী এবং ইউক্রেন যুদ্ধের বিরুপ প্রভাবে তুরস্কে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের বিপরীতে ক্রমাগত তুর্কী মুদ্রা লিরার মান হ্রাস পেতে থাকে। যার ফলস্বরূপ তুরস্কের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ২০২২ সালে এসে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। এদিকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। সেখানে কিনা তুরস্কের এরদোয়ান সরকার ঠিক তার উল্টো পথেই হাঁটতে শুরু করেছেন। তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ১৮ই আগস্ট সুদের হার ১৪% থেকে কমিয়ে ১৩% এ নির্ধারণ করলে তার্কিস মুদ্রা লিরার মান ১ ডলারের বিপরীতে কিছুটা কমে ১৮.০৯ লিরায় নেমে আসে।
চলতি ২০২২ সালের ১৭ই ডিসেম্বরের হিসেব অনুযায়ী এক ডলারের বিপরীতে ১৮.৬৪ তুর্কী লিরাতে লেনদেন করা হয়। তাছাড়া গত ২০২১ সালের ২৬শে অক্টোবরে ১ ডলারের বিপরীতে তুর্কী মুদ্রা ৯.৬১ লিরাতে লেনদেন করা হয়। যেখানে কিনা তার মাত্র কয়েক দিন আগেই ২০২১ সালের ১০ই অক্টোবর ১ ডলারের বিপরীতে ৮.৯৬ লিরা এবং গত বছরের ১২ই আগস্ট ৮.৪৪ লিরাতে লেনদেন করা হয়। অথচ ২০১৬ সালের ১৩ই জানুয়ারি ডলারের বিপরীতে তুরস্কের মুদ্রার মূল্য ছিল ০.৩৩ লিরা এবং ২০১৫ সালের ১লা জানুয়ারিতে ছিল ২.৩৩ লিরা।
চলতি ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে তুরস্কের সার্বিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৮৫.৫১%। যা কিনা গত জুলাই মাসে ছিল ৭৯.৬%। যেখানে কিনা চলতি ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে দেশটির মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৬৯.৯৭%। আর ২০০২ সালের পর এটা সবচেয়ে বেশি মাত্রায় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির ঘটনা। তাছাড়া গত মার্চ মাসে এই মুদ্রাস্ফীতি ছিল কিন্তু ৬১%।
ইউকীপিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, ২০২২ সালে তুরস্কের নমিনাল জিডিপির আকার ৬৯২ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ যেখানে ২০১৩ সালে দেশটির নমিনাল জিডিপির আকার ছিল ৯৫৭.৮ বিলিয়ন ডলার। তার মানে ২০১৩ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯ বছরে তুরস্কের জিডিপির আকার ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রায় ২৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে। তার পাশাপাশি একই সময়ে ডলারের বিপরীতে তুরস্কের নিজস্ব মুদ্রা লিরার মানের পতন হয়েছে প্রায় ৩০০% পর্যন্ত।
চলতি ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির বেকারত্বের হারও কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১০.২% এ নেমে আসে। যদিও অবশ্য গত এপ্রিল মাসে তুরস্কের সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১১.৩%। তাছাড়া দীর্ঘ দিন থেকেই দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় ৪ মিলিয়ন সিরীয় বা অন্যান্য দেশের শরণার্থীর বোঝা চেপে থাকায় তা কিন্তু সরাসরি তুরস্কের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরণের বিপর্যয় সৃষ্টি করে রেখেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির কারণে দেশটিতে বিদেশী নির্ভর পর্যটন শিল্পখাতে ধস নামার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার্বিকভাবে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
তুরস্কের সার্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদী নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও বৈদেশিক বানিজ্যে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। চলতি ২০২২ সালের ১২ মাসে বৈদেশিক রপ্তানি খাত থেকে দেশটি ৩০০ বিলিয়ন ডলার আয় করবে বলে প্রত্যাশা করে। তাছাড়া ২০২১ সালে তুরস্কের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২২৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৮ সালে ছিল ১৭৭ বিলিয়ন ডলার। যা কিনা ২০২০ সাল অপেক্ষা ৩২.৯% বেশি। তাছাড়া একক বছর হিসেবে ২০২১ সালে ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমানে ২০০ বিলিয়ন ডলারের অধিক পন্য সারা বিশ্বে রপ্তানি করতে সক্ষম হয় দেশটি।
যদিও তুরস্কের সরকারের তরফে বৈশ্বিক রপ্তানির টার্গেট ছিল ২০২১ সালে ১৮৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালের টার্গেট ছিল ১৯৮ বিলিয়ন এবং ২০২৩ সালের রপ্তানির টার্গেট নির্ধারণ করা হয় ২১০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে তুরস্ক রপ্তানি বানিজ্যে গত বছরই ২০২৩ সালের টার্গেটে পৌঁছে গেছে। বর্তমানে তুর্কী এরদোয়ান সরকার ২০২৩ সালের জন্য সারা বিশ্বে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পন্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
তবে ২০২২ সালে তুরস্কের রপ্তানি আয় ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পেলেও থেমে নেয় দেশটির সার্বিক আমদানি ব্যয়। চলতি ২০২২ সাল শেষে দেশটির বৈদেশিক আমদানি ব্যয় ৩২০ বিলিয়ন ডলারের সীমাকে স্পর্শ করতে পারে। যদি গত ২০২১ সালে তুরস্ক মোট ২৯২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২০ সালে ২৩৩ বিলিয়ন ডলারের পন্য সারা বিশ্ব থেকে আমদানি করেছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে ২০২১ সাল থেকে আমাদানি-রপ্তানি বানিজ্যে বড় ধরণের পজিটিভ ভারসাম্য লাভ করছে দেশটি।







