সিরাজুর রহমান:২০২২ সালের শুরু থেকে চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার মধ্যেও ভারতের জাতীয় অর্থনীতি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশেষ করে সারা বিশ্বের খাদ্য ও পন্য রপ্তানিতে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে দেশটি। ভারতের বৈশ্বিক রপ্তানি বিষয়ক এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, ২০২২ সালের শুধু ডিসেম্বর মাসে ভারত ৬১.৮২ বিলিয়ন ডলারের পন্য ও সেবা সারা বিশ্বে রপ্তানি করেছে (মার্চেন্টডাইজ ৩৪.৪৮ বিলিয়ন ডলার ও সার্ভিস খাতে ২৭.৩৪ বিলিয়ন ডলার)। তবে একই সময়ে দেশটি কিন্তু সারা বিশ্ব থেকে ৭৩.৮০ বিলিয়ন ডলারের পন্য ও সেবা আমদানি করে। সে হিসেবে দেশটির বৈদেশিক বানিজ্যে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি বা ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১১.৯৮ বিলিয়ন ডলার। তবে তার আগের বছর ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে বৈদেশিক বানিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১০.০২ বিলিয়ন ডলার।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গত ২০২২ সালের ভারতের বৈদেশিক বানিজ্য (আমদানি-রপ্তানি) এক ট্রিলিয়ন ডলারের সীমাকে স্পর্শ করে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে। গত ২০২২ সালে ভারত সারাবিশ্বে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পন্য রপ্তানি করে এবং একই সময়ে ৭২৩ বিলিয়ন ডলারের পন্য সারাবিশ্ব থেকে আমদানি করে। এক্ষেত্রে আমদানি রপ্তানি বানিজ্যে ২৭৩ বিলিয়ন ডলারের বিশাল পরিমাণ ঘাটতি থাকলেও দেশটির প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স প্রবাহ, সারাবিশ্বে প্রযুক্তি নির্ভর সেবাখাতের প্রায় ২৭৩.৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি এবং পর্যটন শিল্প থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হওয়ায় ভারতের সার্বিক অর্থনীতিতে (ব্যালেন্স অব পেমেন্টে) ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

ভারতের সরকারি হিসেব মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সারা বিশ্বে ভারত অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ৫০.২১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষি পন্য ও খাদ্য রপ্তানি করে। যেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট কৃষি পন্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল কিনা ৪১.৮৭ বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে ভারত মোট প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শুধু কৃষিজাত পন্য ও খাদ্য সারা বিশ্বে রপ্তানি করতে পারে বলে অনুমান করা হয়।

এদিকে ভারতের সাথে চীনের দীর্ঘ মেয়াদী বৈরীতা সম্পর্ক বিরাজ করলেও দেশ দুটির মধ্যে চলমান আন্তর্জাতিক বানিজ্য প্রথম বারের মতো ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের সীমাকে স্পর্শ করেছে। চীনের জেনারেল এডমিনিস্ট্রেশন অফ কাস্টমস (জিএসি) এর দেয়া তথ্যমতে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১২ মাসে চীন-ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্য হয়েছে ১৩৫.৯৮ বিলিয়ন ডলার। যা কিনা গত ২০২১ সাল অপেক্ষা ৮.৪% বেশি বানিজ্য। আসলে গত ২০২২ সালে ভারত চীন থেকে মোট পন্য আমদানি করে ১১৮.৫ বিলিয়ন ডলার। আবার ঠিক একই সময়ে ভারত চীনে পন্য রপ্তানি করে মাত্র ১৭.৪৮ বিলিয়ন ডলার। যেখানে কিনা ভারত ২০২১ সালে চীনে মোট পন্য রপ্তানি করেছিল ২৮.১ বিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে.২০২২ সালে ভারত-চীনের মধ্যে বৈদেশিক (আমদানি-রপ্তানি) বানিজ্যে ভারতের পাহাড় সমান ১০১.০২ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি হয়।

রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ২০শে জানুয়ারি ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১.৭২৭ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭৩.৭২৭ বিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে। যেখানে ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের হিসেব অনুযায়ী ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৩৩.৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। যদিও অবশ্য ভারতের বৈদেশিক ঋন ও দেনার স্থিতির পরিমান ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে ছিল ৬১০.৫ বিলিয়ন ডলার। যেখানে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে দেশটির বৈদেশিক ঋন ও দেনার স্থিতির পরিমাণ ছিল ৫৯৩.১ বিলিয়ন ডলার ছিল। তাই এক বছরের ব্যবধানে দেশটির বৈদেশিক ঋন ও দেনার বোঝা ১৭.৪ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনকে পেছনে ফেলে রেমিট্যান্স আয়ের দিক দিয়ে বিশ্বের প্রথম স্থানীয় দেশে পরিণত হয়েছে ভারত। ভারতের সম্মানিত প্রবাসী কর্মীরা গত ২০২২ সালে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে পাঠিয়েছেন। এটা ছিল বিশ্বের একক কোন দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয়। যেখানে গত ২০২১ সালে ভারতের প্রবাসী কর্মীরা ৮৯.৪ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ‘ওয়ান্ড ইকনোমী আউটলুক রিপোর্ট ২০২৩’ অনুযায়ী বিশ্বের সর্বোচ্চ হারে জিডিপি অর্জনকারী দেশ হিসেবে চলতি ২০২৩ সালে ভারতের জডিপি হার হবে ৬.১% এবং ২০২৪ সালে তা হতে পারে ৬.৮%। তাছাড়া একই সময়ে চীনের জিডিপি হার ৪.৫%, আমেরিকার ১%, জাপানের ০.৯% এবং সৌদি আরবের জিডিপির হার ৩.৪% হতে পারে। তাছাড়া ইউকীপিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, ২০২২ সাল শেষে ভারতের নমিনাল জিডিপির আকার ৩.৪৬৯ ট্রিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২,৪৬৬ ডলার দেখানো হয়েছে। যদিও অবশ্য একই সময়ে চীনের নমিনাল জিডিপি’র আকার ১৮.৩২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে আমেরিকার জিডিপি’র আকার ২৫.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে।

আজকের ৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩ এর হিসেব অনুযায়ী এক ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রা ৮২.২৩ রুপীতে লেনদেন হয়। যেখানে গত ২০২২ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর এক ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার ৮১.৯৩ রুপি নির্ধারণ করা হয়েছিল। অথচ ২০২২ সালের ১২ই আগস্টের হিসেব অনুযায়ী ভারতে এক ডলারের বিপরীতে ৭৯.৬৩ রুপীতে লেনদেন হয় এবং গত ২০২১ সালের ১৮ই জানুয়ারিতে এক ডলারের বিপরীতে ভারতের মুদ্রার মান ছিল ৭৩.২০ রুপী। তাছাড়া গত ২০২২ সালে ভারতের গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৬.৭%। যা গত ২০২১ সালে ৫.১% এবং ২০২০ সালে গড়ে ৬.৬% ছিল। আবার চলতি ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের হিসেব অনুযায়ী ভারতের সার্বিক বেকারত্বের হার কিন্তু ৭.১৪%। যা অর্থনীতির দৃষ্টিতে আপাতত মোটেও কোন আশাঙ্খাজনক বেকারত্বের হার বলা চলে না।