আমরা পশ্চিমের খারাপ দিক যতটা আগ্রহ নিয়ে বরণ করে নিই তারচেয়ে শতগুণ নিস্পৃহভাবে,পশ্চিমের ভাল দিকটাকে এড়িয়ে চলি। তাদের কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান আর্থিক দৈন্যতায় পতিত হলে তাকে পুনরুজ্জীবন করতে সরকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রাণপন চেষ্টায় রত হয়। আবার কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েও চলমান রাখতে সক্ষম না।

অতএব, তাঁকে নিরাপদ প্রস্হানের সুরক্ষিত বিধান পশ্চিমে আছে। এই যে ঋণ খেলাপী ঘোষণার তোড় জোড় এ কারবার আমলা ও কামলাদের। বার বার ঘুঘু’র ধান খেয়ে যাবার মত বেগম পাড়ার এ হোতাদের পাকড়াও করতে পারলে থলের বিড়াল বেরুবে। কিন্তু পাকড়াও করবে কে? অতএব, নেপথ্যের সুদ খাদক, ঘুষ খাদকদেরই বড় গলা-“কেস্টা বেটাই চোর”।অতএব, দৃষ্টি অন্য খাতে প্রবাহিত করতে ব্যবসায়ীদের “কেস্টা বেটা” নামক ঝণ খেলাপী’র নাটিকা পরিবেশন।

তা না হলে কানাডা’র বেগম পাড়ায় কেন তথাকথিত ঝণ খেলাপী’র টিকিটিরও দেখা নেই। সংসদে প্রদত্ত অর্থমন্ত্রীর তথ্যে বেগম পাড়ায় আমলাদের সমারোহ। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উৎকোচের টাকায় বেগম পাড়ার বিলাসী জীবন। যাদের টাকায় বিলাসী জীবন বেগম পাড়ায়। তাদেরকেই বলে ঝণ খেলাপী। এ যে দেখছি- “উল্টো চোর কতোয়ালকে ডাকে”।

এখানে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে ব্যবসায়ীরা কেন উৎকোচ দিবে? কেন দিবে না? উৎকোচ না দিলে তাকে এমন হাইকোর্ট দেখাবে যে ব্যবসা এবং জীবন দু’টোই বরবাদ। এহেন আমলাদের প্ররোচনায় পশ্চিমী বিধানাবলি পরিহার করে কতদিন চলতে পারবো? এই একলা চলোরে নীতিতে বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি যুগের চুডায় অবস্হান করে দরজা জানালা বন্ধ করে থাকলে প্রলয় বন্ধ থাকবে? নাহ্। তাই যখনই কোন কারখানা দুর্বল হয়ে পড়বে তৎক্ষনাৎ সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে একে সারিয়ে তুলতে হবে। কেন?

১. আবার স্বাভাবিক কার্যক্রমে শিল্প বহাল হলে রাজস্বের উৎস সৃষ্টি হবে। কর্ম সংস্থান হবে।
২. যতোই সরকার তরুণদের-“চাকুরী করব না, চাকুরী দেব”। ব্রত নিয়ে এগিয়ে যেয়ে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করুক না কেন এটা ততদিন ফলপ্রসূ হবে না, যতদিন পর্যন্ত তারা অগ্রজদের নিরাপদ না দেখবে।

অর্থাৎ একজন তরুণ কখনোই এমন কোন ঝুঁকি নেবে না, যে ঝুঁকিতে কেউ পাশে দাঁড়ায় না। কাজেই মেধাবীদের সরকারকেই চাকুরী দিতে হয়। সরকারী বেসরকারী ব্যাংককে চাকুরী নেয় মেধাবীরা। শিল্প উদ্যোক্তা হতে মেধাবীরা অনীহ। উদ্যোক্তা হতে মেধাবীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেললে সেটা সমাজের জন্য ভাল ফল বয়ে অতীতেও আনেনি ভবিষ্যতেও আনবে না। আর মেধাবীরা না এলে শিল্প পত্র-পল্লবে বিকশিত হবে না।

মেধাবীরা উদ্যোক্তা হবার বদলে সরকারী চাকুরীতে যায়। অত:পর উৎকোচ বানিজ্যে জড়ায়। ঝুঁকি বিহীন অঢেল আয়। অত:পর তা গড়ায় বেগম পাড়ায়। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা আসে উদ্যোক্তা হয়ে। এ যেন মাদ্রাসা শিক্ষার মতো। বাংলাদেশে সচরাচর দেখা যায় পরিবারের যে সন্তান পড়া শুনায় কাঁচা তাকেই কেবল মাদ্রাসা শিক্ষায় প্রেরণ করা হয়। আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত গণ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মূলক পদ পদবীতে অধিষ্ঠিত না হতে পারার পেছনে ইহা প্রধানতম কারণ।

আমাদের শিল্প উদ্যোক্তারা যে প্রায়শই মেধাবী আমলাদের কুট বুদ্ধির চালে ধরাসায়ী হয়, তার কার্যকারণও প্রধানত: এইটি। “ঋণ খেলাপী”-র ঢোলটা এই মেধাবী আমলারাই বেশি বাজায়। যাতে আর সব অন্যায় অনিয়ম ঢাকা পড়ে। এই প্রবণতাটি খুবসম্ভব হাই কোর্টের একটি বেন্চ সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। একজন আইনজীবী বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। এই বিদগ্ধ আইনজীবী গণই হাইকোর্ট বেন্চে নিয়োগ পান বলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় ঝদ্ধ বেন্চ সরকার পক্ষকে তীব্র ঝাঁঝের সাথে বলেন- “দুদক যদি ব্যবসায়ীদের পেছনে এভাবে তাড়া করে তবে,দেশে শিল্পের প্রসার হবে কিভাবে”?

হক কথা। অতীতে শিল্পেক্ষেত্রে আশানুরূপ লক্ষ্যমাত্রা যে অর্জিত হয়নাই তা অনেক কারণাবলীর মধ্যে এটি একটি সর্বাংশে লক্ষনীয় মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ভবিষ্যতেও আমরা যদি “ঋণ খেলাপী” তকমার এই ধারাকে অব্যাহত রাখি তাহলে আমরা আর কখনোই শিল্পের কাংক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব না। এতে করে আরেক সমস্যায় আমরা জড়িয়ে যাব।

আমাদের এস.এম.ই বিকশিত হবে না। অন্যভাবে বলা ভাল, মেধাশূন্য এস.এম.ই বিকশিত হবে। সুতরাং মেধাশূন্য শিল্প বিকশিত হবে। ফলাফলও যা হওয়ার তা-ই হবে। চাঁদের অপর অন্ধকার পিঠে আরেক প্রকটতর অর্থনৈতিক নৈরাজ্যকর ও উদ্বেগজনক পরিস্হিতির উদ্ভব হবে। আর তা হল: “যার আছে, তার অনেক থাকবে। আর যার নেই তার কিছুই থাকবে না”।

ভয়াবহ এক সামাজিক অস্থিরতার উদ্রেক হবে। এই আর্থ সামাজিক অস্থিরতার শেষ কোথায় আমাদেরকে নিয়ে যাবে? কোন এক বলশেভিক বিপ্লবের দিকে? আল্লাহ মালুম ! অর্থাৎ এই ধারাবাহিকতা আমাদের শিল্পকে উত্তরাধিকার শিল্পের চারণভূমিতে পরিণত করবে। এক কথায় বলতে হয় দেশের বড় বড় শিল্পগ্রুপ গুলো ফুলে ফেঁপে আরো বড়ো হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান তৃণের সাথে মিশে যাবে অথবা বড় শিল্প গ্রুপগুলো অধিগ্রহণ করবে। মাৎসন্যায় প্রত্যক্ষ করার সুবর্ণ সুযোগ ! সাবেক পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান জাগ্রত হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তুচ্ছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার যে রেওয়াজ চালু হয়েছিল তার ছন্দপতন ঘটবে। নি:সন্দেহে। …(চলবে)